ধর্ম ও মার্কসবাদ: আলী শরীয়তির একটি “ইসলামী” পর্যালোচনা প্রসঙ্গে


১.

অনেকেই আলী শরীয়তিকে ১৯৭৯ সালে সংগঠিত ইরানি বিপ্লবের ভাবাদর্শিক স্থপতি বা রূপকার হিসাবে আখ্যা দিয়ে থাকেন। তাকে একই সাথে আমূল পরিবর্তনকামি ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মার্কসবাদ ও অন্যান্য “পশ্চিমা ভ্রান্ত মতবাদ সমূহের” তুখোড় পর্যালোচক বুদ্ধিজীবী এবং মার্কসীয় সামাজিক ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত একজন লেখক হিসাবেও বিবেচনা করা হয়।

ইরানের লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত তরুণের ভাবাদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তর ও পরিশুদ্ধি সাধনে শরীয়তির ভূমিকা নিয়ে খুব কমই মতানৈক্য রয়েছে। বিশেষত, ঔপনিবেশিক মনোগঠনের বাইরে মধ্যবিত্তের চিন্তাকে চালিত করে নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের সাথে বৈপ্লবিক লড়াইয়ের যোগসূত্র স্থাপনের তাত্ত্বিক কাঠামোটি তিনি নিরলস প্রচেষ্টায় প্রস্তুত করেন। নিজের জনগোষ্ঠীর মধ্যে পশ্চিমা আধুনিকতা আরোপিত ধ্যানধারণার রাজনৈতিক বিভাজন ও দূরত্ব নিরসনে অনন্য ভূমিকা পালন করেন। তার প্রচেষ্টার ফলেই মূলত, ইসলামী ধারার সাথে শহুরে বাম ও জাতীয়তাবাদী ধারা রাজনৈতিক মৈত্রীর সূচনার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তিনি মতদির্শিক বিতর্কের একটি সুস্থ্য ও কার্যকর ধারা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি আধুনিক সামাজিক বিজ্ঞানে ব্যবহৃত “বৈজ্ঞানিক” ধারণা সমূহের মধ্য দিয়ে ইসলামের পুনঃব্যাখ্যায় তাঁর অনুসারীদেরকে এক সুদৃঢ় ও শক্তিশালী ভাবাদর্শিক অবলম্বন দান করেন, যা পুরোনো ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিকশ্রেণীর পক্ষে কখনই সম্ভব ছিল না ।

তবে শরীয়তির ইসলামকে নতুন ব্যাখ্যায় বুদ্ধিবৃত্তিক চমৎকারিত্বে উপস্থাপনের সাথে তাঁর আমূল পরিবর্তনকামি রাজনৈতিক অবস্থানের মেলবন্ধন নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন এবং সংশয় ছিল। অনেকের অভিযোগ, ইরানের শাহ আমলের দমনপীড়নমূলক দিনগুলিতে তাঁর শ্রোতাদের চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখতে সফল হলেও বস্তুত মৌলিক পার্থক্যের জায়গায় উপনিত হয় নি। এবং এরকম একটি বুদ্ধিবৃত্তিক চমৎকারিত্ব নিজেকেই সম্ভবত এমন একটি বাস্তবতার মধ্যে প্রতিফলিত করেছিল যে, সমসাময়িক ইরানি বুদ্ধিজীবীগণ কর্তৃক তার কর্মসমূহের কোনো গভীর মুল্যায়ন তখনও পর্যন্ত হাজির হয় নি।

২.

আলী শরীয়তি ১৯৩৩ সালে উত্তর খোরাসানের একটি গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন এবং সেখানেই তিনি তার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তাঁর মা ছিল একজন জমিদারের কন্যা এবং তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ স্থানীয় ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষক যিনি তাঁর ছাত্রদেরকে আধুনিক চিন্তাবীদদের চিন্তাভাবনাসমূহের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। শরীয়তির পিতা আল্লা-খোদায় বিশ্বাসী পয়বন্দ-ধার্মিক সমাজতন্ত্রীদের একটি ছোট্ট আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। শরীয়তি নিজেও এর একজন সদস্য ছিলেন এবং এর মধ্যদিয়েই সে তাঁর ইসলামী জ্ঞানের প্রথম সুক্ষ পাঠটি লাভ করেন। এর পর মাশাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি “আবু জর গিফারি : খোদা-বিশ্বাসী সমাজতন্ত্রী” নামক একটি লেখা অনুবাদ করেন এবং মাশাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি ও ফরাসি ভাষায় পড়াশোনা চালিয়ে যান। ঐসময় তিনি তাঁর পিতার অনুসারীদের নিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত “ন্যাশনালফ্রন্ট” নামক সংগঠনটিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালান। এই সংগঠনটি মূলত ১৯৪০-এর দশকের শেষদিকে জাতীয়তাবাদী মন্ত্রী মোসাদ্দেক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তার এই কর্মকান্ডের জন্য তাকে ৮মাস জেল খাটতে হয়।

এরপর তিনি প্যারিস চলে যান, যা ছিল ঐসময়ের প্রধান ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর একটির রাজধানী। তিনি সেখানে কয়েক বছর অতিবাহিত করেন। তার এই প্যারিস গমন তার রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বচ্ছতা পরিগঠন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একটি সন্ধিক্ষণ হিসাবে আবির্ভুত হয়। ঐ সময়কালটাতে সারা বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী তীব্র আন্দোলন-সংগ্রাম চলছিল। তিনি প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ত্বের উপর পড়াশোনা শুরু করেন। সেখানে তিনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও ছাত্ররাজনীতির সাথে যোগদেন এবং পারস্যের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ফারসি ভাষায় দুটি সাময়ীকি সম্পাদনা করেন এর পাশাপাশি তিনি র‌্যাডিকাল মার্কসবাদী ও প্রাচ্যবাদীদের লেখাজোখা এবং অজগেন, চে গুয়েভারা, জাঁ পল সার্ত, ফ্রানৎজ ফেনন এবং লুঁই ম্যাসিনো (ইসলামি মরমীবাদের বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ) সহ প্রমূখ লেখকদের লেখাজোখারও অনুবাদ করেন। এই সময়ে তিনি পশ্চিমা প্রাচ্যবাদ ও র‌্যাডিকাল ক্যাথলিকবাদেরও ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করেন। এছাড়াও তিনি ফরাসি সমাজতন্ত্রী যেমন রেমন্ড অ্যারন, রোজার গারুদি, জর্জ পলিৎজার এবং বিশেষ করে দ্বান্দ্বিকতার প্রখ্যাত ফরাসি পন্ডিত র্জজ গুর্ভিচের চিন্তা-ভাবনা সমূহের সাথে পরিচিত হন।

১৯৬৫ সালে তিনি ইরানে ফিরে আসেন। ইরানে ফিরে আসার সাথে সাথেই বিদেশে তার রাজনৈতিক কর্মকান্ডের অভিযোগে তাকে ৮মাসের জন্য জেলে পোরা হয়। ছাড়া পাওয়ার পর পাঁচ বছর তিনি মাশাদের সাহিত্য কলেজে শিক্ষকতা করেন। এবং এরপর তিনি তেহরানে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, তার রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের সবচেয়ে উদ্ভাবনী ও ফলপ্রসূ সময়কালটি অতিবাহিত করেন। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি উত্তর তেহরানের হুসাইনিয়াহ ইরশাদ নামক একটি আধুনিক ইসলামি কেন্দ্রে ভাষণ প্রদান করে যান। তাঁর ভাষণসমূহ টেপ-রেকর্ড করে এবং বই আকারে সংকলন করে প্রকাশ করা হতো। এসবের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল “ইসলাম শিনাসী” (ইসলাম-তত্ত্ববিদ্যা)। এ সম্পর্কিত তার ভাষণগুলি কয়েকটি খণ্ডে সংকলিত হয় এবং মুসলিম যুবাদের মধ্যে ব্যাপকহারে পঠিত হয়।

১৯৭২ সালে হুসাইনিয়াহ কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেয়া হয় এই অভিযোগে যে এটি মুজাহিদিন-ই-খালক নামক একটি বিপ্লবী মুসলিম গোষ্ঠীর আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে, যারা ইতিমধ্যে শাহী শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেছে। ইরভান্দ আব্রাহামিয়ান নামক একজন ইরানি ঐতিহাসিক মনে করেন যে রক্ষণশীল মোল্লারাও শরীয়তির ভাষণ প্রদান বন্ধ করার ক্ষেত্রে প্ররোচনা দেয়। কেননা তারা মনে করতো যে শরীয়তি ইসলামের নামে বরং পশ্চিমা দর্শন বিশেষ করে মার্কসের সমাজতত্ত্বেরই প্রচারণা চালাচ্ছে। হুসাইনিয়াহ কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়ার পর শরীয়তিকে মুজাহিদদের সাথে সম্পর্কের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। তাঁকে ১৮ মাস পর জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর প্রখ্যাত দৈনিক “কায়হান” পত্রিকায় “ইনসান, ইসলাম ওয়া মার্কসিজম” শিরোনামে তার অনেকগুলো লেখা প্রকাশিত হয়। ১৯৭৭ সালে তিনি দেশত্যাগ করেন, এবং একমাস পর লন্ডনে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর তিনি তার অনুসারীদের কাছে একজন মহানায়ক হিসাবে আবির্ভুত হন।

৩.

আলী শরীয়তির ভাবাদর্শিক ও রাজনীতিক অবস্থান নিয়ে তেমন কোনো মতানৈক্য নেই তবে তার ভাবাদর্শিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রকৃতি এবং তার বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। আরও স্পষ্ট করে বললে, তার “ইসলামি মার্কসবাদ”, এবং কিছু আধুনিক মার্কসবাদী ধারণা যেমন “শ্রেণী শোষণ”, “শ্রেণীসংগ্রাম”, “শ্রেণীহীন সমাজ”, “সাম্রাজ্যবাদ” প্রভৃতিকে ইমাম আলী, ইমাম হোসাইন এবং আবুজর গিফারি প্রমূখ (যাদেরকে শরীয়তি প্রথম খোদা-বিশ্বাসী সমাজতান্ত্রিক হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন) ইমামদের দীক্ষার সাথে যুক্ত করে সদ্ব্যাবহার করার প্রচেষ্টাকে ঘিরে অনেক বিতর্ক রয়েছে। ইরানের বিপ্লবপূর্ব সংকটময় অস্থির দিনগুলোতে এবং বাম ও ইসলামী দলগুলোর মধ্যে একটি বড় ধরনের বিভাজন থাকার পরিপ্রেক্ষিতে শরীয়তির চিন্তাভাবনাসমূহ একদিকে দুটি ধারার মধ্যে একটি সংযোগ স্থাপন এবং অন্যদিকে একটি গোলমালপাঁকানো পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটায়। এইর মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ করে ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত শরীয়তির নতুন লেখাজোখা “ইনসান, ইসলাম ও মার্কসবাদ”, যেখানে তিনি মার্কসবাদী মূলনীতিসমূহের সাথে পদ্ধতিগতভাবে মোকাবেলা করার চেষ্টা করেছেন। এর প্রায় দশ বছর পর শরীয়তির ঐ লেখাটিই ইংরেজিতে Marxism and Other Western Fallacies নামক নতুন শিরোনামে ক্যলিফোর্নিয়া থেকে প্রকাশিত হয়।

৪.

বইটিতে প্রধানত মার্কসবাদসহ বিদ্যমান মানবতাবাদী দর্শনসমূহের পর্যালোচনা করে ‘মানুষ’ সম্পর্কিত একটি আমূল পরিবর্তনকামি ইসলামি ধারণার প্রস্তাবনা পেশ করা হয়। পুরো বইটিতে চারটি প্রধান চিন্তাধারা নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়।

প্রথমত, দেখানো হয় যে, পশ্চিমা দর্শনসমূহ- পশ্চিমা উদারনৈতিকতাবাদ, অস্তিত্ত্ববাদ এবং মার্কসবাদ- একটি মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে, তবে তাদের এই মানবতাবাদের ধারণা হলো বস্তুবাদী। এবং এই পশ্চিমা মানবতাবাদ মূলত প্রাচীন গ্রীসের পৌরাণিক দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করেই গঠিত হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষ এবং দেবতাদের মধ্যে, যারা মানুষকে সবসময় একটি অন্ধকার ও মুর্খতার মধ্যে রাখতে চায়, প্রতিনিয়ত একটি সংগ্রাম চলতে থাকে। এবং এখানে মানুষকে দেবতাদের বিপরীতে একটি উচ্চ আসনে বসানো হয়। অতএব, এই মানবতাবাদে মানুষ এবং দেবতাদের মধ্যকার বৈরিতার প্রতিক্রিয়াজাত একটি দূরত্ব তৈরি করে। বইটিতে তর্ক তোলা হয় যে, দিদেরো এবং ভলতেয়ার থেকে ফয়েরবাখ এবং মার্কস পর্যন্ত সকলেই মূলত মানুষের বিরুদ্ধতায় প্রতিনিয়ত উন্মুখ এই সমস্ত স্বৈরাচারী ও নিষ্ঠুর দেবতাদের ধারণার সাথে অন্যান্য পরমাত্মিক ইশ্বরের ধারণাকে গুলিয়ে ফেলে, যেমন- আহুরামাজদা, রাম, তাও, মেসিয়াহ, আল্লাহ প্রভৃতি। যেখানে সম্পর্ক মৌলিকভাবেই ভিন্ন- সাহায্য, সৌহাদ্য, পথপ্রদর্শন ও পরমার্থিক সত্তার গুণাবলি অর্জনের সহায়ক । যেহেতু এই সমস্ত দার্শনিকরা মানুষ বনাম ইশ্বরের লড়াইয়ের এই গ্রীক বৈপরিত্যমূলক ধারণার ভুলভাবে অতিসরলীকরণ করেছেন সুতরাং তাদের মানবতাবাদ হচ্ছে দুনিয়াবি, নশ্বর এবং এককথায় বস্তুবাদী। সুতরাং এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে কমিউনিস্ট সমাজ তাদের মানুষ সম্পর্কিত ভাবনায় ইওরোপীয় বুর্জোয়া ধারণার থেকে পৃথক কিছু নয়। উভয় ধারণার মধ্যেই সবকিছুই মানুষের মধ্যেই গিয়ে শেষ হয়, উভয়েই মানুষের মূল-সত্তার পরমার্থিক সম্ভাবনার দিগন্তকে বিবেচনার বাইরে রাখে। অন্য অর্থে পশ্চিমা মানবতাবাদ হচ্ছে নাস্তিক্যবাদী কেননা এটা মনে করে যে মানুষ স্বভাবগতভাবেই একটি মূল্যচেতন্য ধারণ করে যা তার মুল্যবোধসমূহ নির্ধারণ করে দেয় এবং ইশ্বরের বিকল্প হিসাবে ভূমিকা পালন করে। বইটিতে আরও বলা হয় যে, পশ্চিমা দর্শনসমূহ যা মানুষ ও ঈশ্বরের মধ্যে একটি বিভেদ দাঁড়করায় তা প্রাচ্য ধর্ম সমূহ যেমন, হিন্দু, ইসলাম বা সুফিবাদ সম্পর্কে অজ্ঞ। এই ধর্মসমূহ ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে সম্মীলনের ধারণার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, এবং এভাবেই তাদের মানবতাবাদ অপার্থিব।

দ্বিতীয়ত, বইটিতে বলা হয় যে, যদিও আমরা এটা স্বীকার করে নিতে পারি যে পশ্চিমা মনবতাবাদী এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাধারাসমূহ তাত্ত্বিকভাবে মানুষকে মুক্তকরনের একটি নীতি ধারণ করে কিন্তু চর্চার ক্ষেত্রে তারা তাদের বাস্তবতার এই রূপটি হারিয়ে ফেলেছে। যেমন উদাহরণ হিসাবে মার্কসবাদের কথা, যা পুঁজিতন্ত্রের অমানবিকতা থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিল। অথচ বাস্তব চর্চার ক্ষেত্রে এটিও মানুষের প্রতি পুঁজিতন্ত্রের মতন একই মনোভঙ্গির লালন করেছে, যেমন উদাহরণত Ñ জাগতিক সমৃদ্ধির প্রতি আসক্তি, বস্তুবাদিতা, ভোগবাদিতা প্রভৃতি। অন্যদিকে ঠিক একইভাবে খ্রিস্টান ধর্ম, ইসলাম এবং তাওবাদ প্রভৃতি ধর্মও মানুষকে মুক্তকরনের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে আমলাতান্ত্রিক, ক্ষমতা-পিপাসু এবং জাগতিক চার্চ বা যাজকতন্ত্রে এবং গণ-যজ্ঞ, লোকাচার ও কুসংস্কারে পর্যবসিত হয়। একইভাবে রেনেসাঁর চৈতন্যও (যা চেতনা , বিজ্ঞান ও বুদ্ধির পুনর্জাগরণ বুঝাতো) পুঁজিতন্ত্র, বিজ্ঞানবাদীতা এবং উদারনৈতিকতাবাদে পর্যবসিত হয়, যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অহংবাদীতা, সুবিধাবাদ এবং ভোগবাদ এবং এর মধ্যে বিশ্বাস, ভাব, ভালোবাসা, জীবনের অর্থ এবং মানুষের প্রতি কোন মনোযোগ দেয়া হয় নি।

তৃতীয়ত, মার্কসবাদ যেহেতু এমন একটি সমন্বিত ভাবাদর্শ যা অর্থনীতি, রাজনীতি, নীতিবিদ্যা, ইতিহাস, দর্শন প্রভৃতি নিয়ে কায়কারবার করে সেহেতু জীবন ব্যবস্থার রূপকল্প বলে দাবিদার ইসলামের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ এবং এটিকে অবশ্যই আগাগোড়া মোকাবেলা করতে হবে। এরপর শরীয়তি মার্কসবাদের প্রধান প্রধান দার্শনিক তর্কগুলিকে ইসলামের জায়গা থেকে মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছেন। প্রথমেই তিনি বলেন যে, অন্যান্য পশ্চিমা মানবতাবাদী ধারা সমূহের মতোই মার্কসের ধর্মের পর্যালোচনাও গ্রীক মানবতাবাদি দর্শনের উপর ভিত্তি করেই গঠিত যা মানুষ ও ইশ্বরের মধ্যে ঐক্যের চেয়ে বরং বিরোধই দাঁড়করায়। অপরপক্ষে ইসলামে বান্দা ও খোদার সম্পর্ক তাওহীদ বা ঐক্যের ধারণার উপর ভিত্তি করে গঠিত। মার্কসবাদে ধর্ম হচ্ছে যুক্তিবাদীতার ঊর্ধ্বের একটি বিষয় যা মূলত মানুষের অসহায়ত্বকে নির্দেশ করে। অন্যদিকে মুসলিমরা বিশ্বাস করে যে, ইসলামের স্বর্গ ও নরকের ধারণা যৌক্তিক। অপরপক্ষে, মার্ক্স তার তর্ক হাজির করেন, ভেতরকাঠামো ও উপরিকাঠামোর ধারণার উপর ভিত্তি করে, যা মানুষকে উপরিকাঠামোর অংশ হিসাবে বিবেচনা করে এবং তাকে শুধু একটি হাতিয়ার হিসাবেই গণ্য করে; এবং ধর্ম, নীতিবিদ্যা, নৈতিকতা, মানুষের সদগুণাবলী প্রভৃতি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা-ই নির্ধারণ করে দেয় বলে বিবেচনা করে। এখানে মানুষের কোনো স্বাধীন এবং মর্যাদাকর বাস্তবতা নেই। ইসলাম এমন ধরনের ভাবনা একদমই খারিজ করে দেয়। একইভাবে বইটিতে শরীয়তি অভিযোগ করেন যে, মার্কস মানুষকে ইতিহাসের কোনো তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকার জায়গায় বসান না। তিনি বলেন, মার্কসীয় তত্ত্বে মানুষ যৌক্তিকভাবেই অক্ষম যেহেতু সে তার চারপাশের পরিস্থিতির উৎপন্ন একটি সত্তা। ইতিহাসের পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় মানুষের স্বাধীন কোনো ভূমিকা নেই বরং তা উৎপাদন সম্পর্ক এবং উৎপাদন শক্তির দ্বন্দ-সংঘাতের ফল। শরীয়তি বলেন, যদি তাই হয় তাহলে ইতিহাসের এতসব শহীদ, আন্দোলন -সংগ্রাম এবং বিপ্লব সমূহর কি নির্থক !?

সবশেষে, শরীয়তি বলেন, যে-মার্কসবাদ নিজেকে পুঁজিতন্ত্রের নির্দয় পর্যালোচনা বলে গর্ব করে কিন্তু কার্যত তা পুঁজিতন্ত্রের ন্যায় একই মনোভঙ্গি লালন করে এগিয়ে যায়। পুঁজিতন্ত্র এবং সাম্যবাদ দুটি ব্যাবস্থাই চর্চার ক্ষেত্রে “উৎপাদনবাদীতা”, “প্রয়োগবাদী আমলাতন্ত্র”, “অধিকতর অর্জনপ্রবণতা”, “অর্থনীতিক প্রতিযোগিতা”, এবং “বস্তুবাদীতা” প্রভৃতির উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। যা এখন স্টালিনবাদ বলে সমালোচিত হচ্ছে তা মূলত লেলিনবাদ বা খোদ মার্কসবাদেরই ধারাবাহিকতা।

সমাজতন্ত্র এবং পুঁজিতন্ত্রের পার্থক্য শুধু একটা জায়গায়ই, সেটা হলো, উৎপাদনের উপকরণ সমূহ পুঁজিতন্ত্রে একটি বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করে আর অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক সমাজে তা নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র।

চতুর্থত, শরীয়তির মতে, শুধুমাত্র ইসলামই প্রকৃত ‘মানবতা’ ধারণ করে। তার মতে, ইসলামে মানবতা হচ্ছে মানুষের মধ্যে রূহানী মূল্যবোধসমূহের একটি সমষ্টি যা তার নৈতিক এবং ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে তোলে। তাওহীদের ধারণার প্রতি নির্দেশ করে শরীয়তি বলেন যে, ইসলামে মানুষকে জাগতিক ও স্বর্গীয় চৈতন্য, হীন বর্জ্য ও খোদায়ী বৈশিষ্ট্য এবং একটির উপর আরেকটিকে বেছে নেয়ার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ধারণকারী দ্বৈত প্রবণতার অধিকারী সত্তার হিসাবে দেখা হয়। এরপর বলা হয় যে, প্রথমত, ইসলামে মানুষের মর্যাদা সে মানুষ শুধু এইজন্য নয় বরং খোদার সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতেই তার একটি মর্যাদাকর অবস্থান রয়েছে। দ্বিতীয়ত, মানুষের একটি অভিষ্ঠ গন্তব্য রয়েছে। তৃতীয়ত, মানুষের বিকল্প পছন্দের একটি স্বাধীন ইচ্ছাও রয়েছে। বেছে নেয়ার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধিকার মানুষের উপর তার নিজেকে ধূলিশয্যা থেকে খোদার সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়ার একটি দায়িত্বও অর্পণ করে (এটি হেগেলের পরম ভাব, যা নাই থেকে সবকিছু হয়ে ওঠা, এ ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ)। শরীয়তির মতে, এই দায়িত্ববোধ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ধারণা এবং শরীয়তি এর নিহিতার্থকে দর্শন ও ধর্মতাত্ত্বিক জগৎ থেকে রাজনীতির জগতে স¤প্রসারিত করেন। এর উপর ভিত্তি করেই তিনি তৃতীয় বিশ্বের এবং বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে তাদের দাসত্ব-দশা ঘুচিয়ে নিজেদের মুক্তি সাধন ও নিজেদেরকে “খোদার প্রতিনিধি” হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার ডাক দেন।

আমাদের নিজেদেরকে মুক্ত করার দায় একই সাথে স্বনির্ভরতার প্রতিও ইংগিত করে; আরও স্পষ্ট করে বললে এর মানে হচ্ছে সাংস্কৃতিক, রাজনীতিক ও কৌশলগত স্বনির্ভরতা যা সোজাসাপ্টা রাজনৈতিক ভাষায়¬ “প্রচ্যও নয় প্রতীচ্যও নয়”, পুজিতন্ত্রও নয় সাম্যবাদও নয় বরং “নিজের দিকে ফিরে আসা” এই বিষয়টিকেই নির্দেশ করে।

৫.

নিঃসন্দেহে আলী শরীয়তি তাঁর লেখাগুলিতে ইসলামের দিক থেকে পশ্চিমা মানবতাবাদী দর্শনসমূহ বিশেষ করে মার্কসবাদের একটি শক্তিশালী পর্যালোচনা হাজির করেছেন। পর্যালোচনাটি পড়লে বুঝা যায়, এটি এমন একজন লোক করেছেন যিনি একইসাথে তার স্বদেশী বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় গভীরভাবে সংশ্লিষ্টতার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দী ইওরোপীয় মতবাদসমূহ সম্পর্কেও সম্যক ওয়াকিবহাল।

যাই হোক, আমাদের আলোচনায় উল্লিখিত প্রাসঙ্গিক রচনা, “মার্কসবাদ ও অন্যান্য পশ্চিমা ভ্রান্ত মতবাদসমূহ” পর্যলোচনাটিতে পদ্ধতিগতভাবে কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি এবং মার্কসের চিন্তাভাবনার গুরুতর ভুল-বুঝাবুঝি রয়েছে। সে বিষয়ে বিস্তারিত বোঝাপড়ার জন্য পাঠকে জর্মন ভাবাদর্শ বইটির সা¤প্রতিক একটি অনুবাদ সংস্করণের প্রতি দৃষ্টি দিতে অনুরোধ করব (জর্মন ভাবাদর্শ, অনুবাদ: গৌতম দাস, ভূমিকা: ফরহাদ মজহার, আগামী প্রকাশনী, ২০০৯)।

বইটিতে মার্কসের ব্যাপারে একটি প্রধান তর্ক হচ্ছে মার্কসের ধর্ম ও মানুষ সম্পর্কিত ভাবনা নিয়ে, যা উপরে সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে। এ ব্যাপারে তার পর্যালোচনায় পদ্ধতিগতভাবে বেশকিছু মুশকিল রয়েছে। যেমন, শরীয়তি বলেছেন যে ধর্ম সম্পর্কে মার্কসের ধারণা হচ্ছে বস্তুবাদী। মার্কসের মতে বিশেষ আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি ধর্মীয় ভাবাদর্শসমূহ, তাদের কাঠামো এবং বিকাশ প্রক্রিয়াকে রূপদান করে থাকে। কিন্তু বইটিতে মার্কসের এই তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতা খন্ডন করে কোনো তর্ক হাজির করা হয়নি।

দ্বিতীয়ত, মার্কস তার ধর্মের পর্যালোচনায় প্রধানত খিস্টবাদের সমাজিক প্রয়োগ বা সামাজিক মূলনীতিসমূহের প্রতি নির্দেশ করেছেন, যেখনে শরীয়তিও একমত হবেন যে, নিপীড়িত শ্রেণীর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গীর্জার রক্ষণশীল ভূমিকা অস্পষ্ট ছিল না।

এটা সত্য যে, ধর্ম বিষয়ে মার্কসের জ্ঞান খ্রিস্টবাদ ও ইহুদিবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল । তিনি ইসলাম, হিন্দু ও তাওবাদের মতো প্রাচ্যের ধর্মসমূহের সাথে অতটা পরিচিত ছিলেন না। বিশ্বের অপরাপর ধর্মসমূহ সম্পর্কে মার্কসের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে হয়তো তাঁর একটি উচিত সমালোচনা করা যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মার্কসের পর্যালোচনার ক্ষেত্রে অনেকেই ধর্ম সম্পর্কে তাঁর ঐতিহাসিক ধারণাকে সধারণীকরণ করে ফেলে অর্থাৎ সব ধর্মের ব্যাপারেই তাঁর মত একই রকম মনে করা হয়। এ ধরনের সাধারণীকরণ স্পষ্টতই প্রয়োগবাদী এবং কোনোভাবেই মার্কসীয় নয়।

ধর্ম ও মানুষ সম্পর্কিত মার্কসীয় ধারণার সাথে বোঝাপড়া করতে গিয়ে বইটিতে পর্যালোচনা মূলত মার্কসের ভেতরকাঠামো ও উপরিকাঠামোর ধারণার উপর কেন্দ্র করে হাজির করা হয়। দেখা যায় বইটিতে এসব ধারণাকে খুব সরলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শরীয়তির বইতে প্রায় একচেটিয়াভাবে মার্কসের হামেশা উদ্বৃত একটি ক্ষুদ্র বই, (Introduction to the Critique of Political Economy) যার মুখবন্ধে, মার্কস তাঁর ঐতিহাসিক বস্তুবাদের প্রাথমিক ধারণাগুলো প্রকাশ করছিলেন মাত্র। তখনো মার্কস তাঁর এসব বিষয়ে পরিণত বোঝাপড়া কোনোভাবেই বিশ্লেষণ সম্পন্ন করে হাজির করেন নি। তাই প্রাথমিক এই রচনার কয়েকটি লাইনের উপর নির্ভর করেই মার্কসের পর্যালোচনা হাজির করা হয়েছে। মনে হয় শরীয়তি এই বিষয়টি বুঝতে ভুল করেছেন যে ধর্ম, নীতিবিদ্যা, সংস্কৃতি, নৈতিকতাসহ উপরিকাঠামোর সকল উপাদানসমূহই উৎপাদনের ধরন ও উৎপাদনের উপায়ের অর্থনৈতিক ভিত্তি দ্বারা খুব বেশি নির্ধারিত নয় বরং তা শর্ত তৈরি করে মাত্র। এবং এ কারণেই শরীয়তির কাছে সে অনুযায়ী মার্কসীয় মতে ধর্ম, সংস্কৃতি, এবং মানবতা একটি যান্ত্রিক ফলাফল হিসাবে উৎপন্ন বলে মনে হয়। যাই হোক, কিন্তু মার্কস এরকম বলেন নি, সেটা জর্মন ভাবাদর্শ মনোযোগের সাথে পাঠ করলেই ধরা দেয়। মার্কসকে সামগ্রিকভাবে পাঠ করলে বুঝা যায় যে মার্কস বলেছেন “উপরিকাঠামো” অর্থনৈতিক ভেতরকাঠামো দ্বারা নির্ধারিত নয় বরং তা এর শর্ত তৈরি করে মাত্র। এছাড়াও এই সম্পর্ক মোটেও একপাক্ষিক নয় বরং পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভর করে গঠিত, তার মানে হলো যে ভাবাদর্শ, ধর্ম, সংস্কৃতি, প্রভৃতিরও অর্থনৈতিক কাঠামোর উপর নানারকম পরিণতি রয়েছে। এবং কৌতুহলোদ্দীপকরুপে, শরীয়তিও তাঁর লেখার বিভিন্ন জায়গায় স্বীকার করেছেন, মার্কসও ভাবাদর্শ, চৈতন্য, এবং মানবীয় নৈতিকতার ভূমিকার কথা কবুল করেছেন। যাই হোক, আসলে প্রচলিত মার্কসবাদী প্রকল্পের মধ্যে এটা দেখতে না পেয়ে শরীয়তি দাবি করেন যে মার্কস অসঙ্গতিপূর্ণ। এবং এই একই তর্ক মানুষের ভূমিকার সাথে ইতিহাসের সম্পর্ক বিষয়েও সত্য।

বইটির পর্যালোচনায় পরিলক্ষিত আরেকটি পদ্ধতিগত সমস্যা হচ্ছে যে, মার্কসের চিন্তাভাবনাসমূহকে আগাগোড়াই অন্যান্য মার্কসবাদীদের, যেমন “বিদ্যমান সমাজতান্ত্রিক সমাজের” নেতাদের সাথে এক করে দেখা হয়েছে। প্রচলিত সমাজতান্ত্রিক সমাজ সমূহকে মার্কসের ভাবনাসমূহের বাস্তবায়ন হিসাবে গণ্য করে শরীয়তি ভাবনা ও বাস্তব চর্চার ফারাক স¤পূর্ণতই উপেক্ষা করেছেন। মার্কসের সাথে স্টালিন এবং ক্রুশ্চেভকে গুলিয়ে ফেলে মার্কসবাদের মূর্ত প্রকাশ হিসাবে বিবেচনা করা আর শরীয়তিকে আয়াতুল্লাহ ফাযলুল্লাহ নূরি, আয়াতুল্লাহ কাশানি (বিশ শতকের দুজন বিখ্যাত রক্ষণশীল ধর্মতাত্ত্বিক) এবং আয়াতুল্লাহ খোমেনির সাথে গুলিয়ে ফেলে ইসলামের মূর্ত প্রকাশ হিসাবে বিবেচনা করা একই কথা। যদি একাট্টা ইসলাম বলে কিছু না থকে তাহলে একাট্টা মার্কসবাদ বলেও কিছু নেই।

তদুপরি শরীয়তি বইটিতে তার সমকালের “সমাজতান্ত্রিক দেশ” সমূহের যেসব মানবীয় মন্দ দিক সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন তার অনেকখানি হয়তো বা সত্য। প্রয়োগবাদীতা, আমলাতন্ত্র, উৎপাদনবাদীতা, “মানবীয় সত্তার এই সকল তাগুতী বৈশিষ্ট্য ” পুঁজিতন্ত্র এবং “ আশ্চর্যভাবে বিদ্যমান সমাজতন্ত্র” উভয়ের মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়। তা সত্ত্বেও এ ব্যপারটাও গুরুত্ত্ব সহকারে বলা দরকার যে এই দুটি ব্যাবস্থাকে একেবারেই একইরকম মনে করা অবশ্যই অতিসরলীকরণ।

এটা অবশ্যই বলা দরকার যে উপরে মার্কসবাদের পর্যালোচনার যেসব ধরন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হল Ñ বিশেষ করে, “ভেতরকাঠামো” এবং “উপরিকাঠামো”র ধারণা সম্পর্কিত তর্ক, সংগঠিত বিপ্লবসমূহ, ইতিহাসে মানুষের ভূমিকা, ‘মানুষ’ নামক ধারণা, সমাজতান্ত্রিক চর্চা প্রভৃতি নিয়ে তর্ক বিতর্ক নতুন কিছু নয়। পশ্চিমা পন্ডিত সমাজের মার্কসবাদী এবং অমার্কসবাদী উভয় ঘরানারই বড় বড় পন্ডিতরা ইতিমধ্যেই মার্কসের সাথে তাদের হিসাব- নিকাশ চুকিয়েছেন।

তবে আলী শরীয়তির প্রস্তাবনার মধ্যে যে জিনিষটি নতুন তা হলো, ইসলামকে মার্কসবাদের বিপরীতে পাল্টা একটি সমন্বিত ধর্মতত্ত্ব, দর্শন এবং একটি বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতিক তৎপরতা আকারে হাজির করার চেষ্টা করা। তিনি মানুষ সম্পর্কে নতুন একটি ইসলামী ধারণার প্রস্তাব হাজির করার চেষ্টা করেছেন যা শুধুমাত্র একটি বিকল্প ইসলামী সমাজে পরিলক্ষিত এবং সক্রিয় হওয়া সম্ভব। তা হলো, ইসলামী মানবতায় মানুষের মর্যাদা শুধু সে মানুষ এই জন্য নয়, বরং খোদার সাথে তার বৈশিষ্ট্যসূচক সম্পর্কের মধ্য দিয়েই তা পরিগঠিত ও স্বীকৃত। এই নতুন ও মৌলিক বিষয়টি সমগ্র বইটি জুড়েই একটি প্রস্তাবনা আকারে হজির ছিল; কিন্তু গভীরভাবে আলোচিত হয় নি, বিশ্লেষিত বা প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি। তার একটি কারণ সম্ভবত হতে পারে যে, এটা একটা ভাষণ থেকে পুনর্লিখিত রচনা।

৬.

তাহলে শরীয়তির সাথে মার্কসবাদের সংযোগটা কি ছিল? সে কি একজন মার্কসবাদী যে নিজেকে প্রকৃত পক্ষে একটি ইসলামি ছদ্মাবরনে লুকিয়ে রেখেছিল? নিঃসন্দেহে শরীয়তি একজন মার্কসবাদী ছিলেন না (যদিও তিনি নিজেকে একজন সমাজতন্ত্রী বলতেন), তবে এটা নিশ্চিত যে তিনি মার্কসীয় সামাজিক ভাবনাসমূহ দ্বারা বেশ প্রভাবিত ছিলেন। তিনি মার্কসের কাছ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা গ্রহণ করেছিলেন যেমন, “শ্রেণী সংগ্রাম”, “শ্রেণী শোষণ”, “শ্রেণীহীন সমাজ”, “ঐতিহাসিক নির্ণয়বাদ”, “সম্রাজ্যবাদ”, “ভেতর-কাঠামো”, “উপরি-কাঠামো”, “উদ্বৃত্ত মুল্য”, এবং “স্থায়ী বিপ্লব” প্রভৃতি ধারণাকে তিনি তার চিন্তাভাবনার পর্যালোচনামূলক কর্মসমূহে পদ্ধতিগতভাবে কাজে লাগিয়েছেন।

এর প্রমাণ পাওয়া যায় শরীয়তির “জাহাতগিরি-ই তাবাকাত-ই ইসলাম (ইসলামের শ্রেণী ঝোঁক)” এবং “উম্মাহ ও ইমামত” নামক সর্বশেষ দুটি লেখায়। এই লেখাগুলিতে, যেখানে তিনি ইসলামের রাজনীতি ও অর্থনীতির সাথে কায়কারবার করেছেন, শরীয়তি পদ্ধতিগতভাবে উপরুক্ত মার্কসীয় অভিধা-প্রকরণ কাজে লাগিয়েছেন। তবে একইসাথে, শরীয়তি এসব ধারণার কোনো কোনোটির নতুন অর্থও করেছেন। তাঁর শ্রেণী সম্পর্কিত ধারণা, যা ১৯৬০ এর দশকের শেষ দিকের প্রখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক জর্জ গুর্ভিচের দ্বারা প্রভাবিত, কোনো অর্থনৈতিক শ্রেণী নয় যা কোনো অর্থনৈতিক স্বার্থের জোটবদ্ধতায় গড়ে ওঠে, বরং তা একটি রাজনৈতিক শ্রেণী যা গড়ে ওঠে ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রতীক, ঐতিহ্য, এবং সাংস্কৃতিক রীতি-নীতি প্রভৃতিকে আশ্রয় করে। শ্রেণী সম্পর্কে এমন একটি রাজনৈতিক ধারণার পাশাপাশি তিনি বলেন যে, তৃতীয় বিশ্ব বিশেষ করে মুসলিম দেশসমূহে সমাজের নের্তৃত্ব প্রদান এবং একটি গভীর পরিবর্তন সাধনের ক্ষেত্রে প্রলেতারিয়েতরা নয় বরং বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাকারী শ্রেণী-ই প্রধানত সক্ষম শ্রেণী।

শরীয়তি কতিপয় মার্কসীয় ধারণাকে যেমন পুনর্ব্যাখ্যায় নিজস্ব বয়ানের মধ্যে সংহত করে নিয়েছেন, তেমনি ইসলামের কিছু মৌলিক ধারণারও পুনর্ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তাঁর মতে বাইবেলের কেইন ও অ্যাবেল ( হাবিল ও কাবিল) এর গল্প মুলত শ্রেণী-সংগ্রামেরই একটি প্রতিকায়ন মাত্র। তেমনি ভাবে “ইনতিজার” (বা দ্বাদশ ইমামের পুনরাগমনের পূর্বাভাস) শুধু মাত্র নিষ্ক্রিয়ভাবে নয় বরং ইনসাফের জন্য লড়াই সংগ্রামে একটি সক্রিয় সংশ্লিষ্টতার পাশাপাশি ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষা করাকেই বুঝায়Ñ এবং এটি এমন এক সংগ্রাম যেখানে লক্ষ্য অর্জন করা একটি নিশ্চত ব্যাপার। শিয়া মতবাদও নিপীড়নকারী ও নিপীড়িতের মধ্যকার একটি শ্রেণী সংগ্রাম ছিল। পুর্ববর্তীরা (“সাফাভি শিয়ারা”) এটিকে একটি নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত করেছিল এবং পরবর্তীরা (“আলাভি বা রেড শিয়ারা) এটিকে আবার মুক্তির ভাবাদর্শ হিসাবে হাজির করে। শিয়া মতবাদকে নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত করার জন্য দায়ী হচ্ছে মূলত ধর্মতাত্ত্বিক মোল্লারা ।

এমনকি শরীয়তির মতে , ধর্মদ্রোহিতার বা কুফরের অভিযোগ “যারা খোদা ও আত্মার অস্তিত্বে অস্বীকার করে” তাদের উপর নয় বরং যারা ধর্মের জন্য সুনির্দিষ্ট এবং বাস্তব পদক্ষেপ নিতে অস্বীকার করে তাদের উপরই প্রয়োগ হওয়া উচিত। “কুফর” সম্পর্কে এই ধরনের বুঝাবুঝির কারণেই শরীয়তি মার্কসবাদীদেরকে রক্ষণশীল মোল্লাদের ন্যায় এই বলে খারিজ করে দেন নি যে তারা দার্শনিকভাবে বস্তুবাদী নাস্তিক, অনৈতিক, এবং কুফরকারী। তার পরিবর্তে তিনি বরং ইসলামী ধর্মতাত্ত্বিকদের এবং ফিকাহশাস্ত্রের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী পর্যালোচনা হাজির করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, আমাদের মসজিদ, বিপ্লবী বামরা, এবং আমাদের (নিচু তলার) প্রচারকরা নিপীড়িত জনগণের জন্য দুনিয়াদার শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। কিন্তু আমাদের ধর্মতাত্ত্বিকরা হচ্ছে পুঁজিবাদি এবং রক্ষণশীল। মোটকথা আমাদের ধর্মতত্ত্ব পুঁজিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে।

পরিশিষ্ট

Marxism and Other Western Fallacies বইটি, যেখানে মার্কসবাদের ব্যাপারে শরীয়তির তর্ক বিতর্ক সবচেয়ে-বেশি পদ্ধতিগতভাবে হাজির করা হয়েছে, মার্কস ও আলী শরীয়তির মধ্যে একটি স্পষ্ট তফাতের চিত্র হাজির করে। তা হলো, শরীয়তির অবস্থানটা আসলে কি? “মার্কসবাদ ও অন্যান্য পশ্চিমা ভ্রান্তমতবাদসমূহ” কি মার্কসবাদের ব্যাপারে শরীয়তির দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করে? আসলে প্রকৃত ঘটনা হলো এই যে, এই বইটির বেশির ভাগ লেখাজোখারই প্রামানিকতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

আসিফ বায়াতের মতে ১৯৭৭ সালে ফারসি ভাষায় তিনি মূল লেখাগুলি যেভাবে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং বাস্তবিক পক্ষে বর্তমান বইটি ও মূল লেখাজোখাগুলোর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে বলার ভঙ্গি ও জোর প্রদানের ক্ষেত্রে ভিন্নতা এবং কিছু বিষয়ের বিলুপ্তি দেখতে যায়। যেমন উদাহরণ হিসাবে তিনি উল্লেখ করেন, মূল ফারসি রচনাটিতে শরীয়তি সমসাময়িক মার্কসবাদীদের ব্যাপারে, যারা মার্কসের চিন্তা-ভাবনাকে বিকৃত করে ফেলতো তাদের ব্যাপারে, মার্কসের হতাশার কথা উল্লেখ করে মার্কসের বিখ্যাত একটি উক্তি “আমি মার্কস, আমি মার্কসবাদী নই” এই উক্তিটি দিয়ে তার লেখা সমাপ্ত করেছিলেন। তবুও, এই সমস্যা এবং সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও আলোচিত প্রসঙ্গগুলোর গুরুত্ব কোনোভাবেই খাটো হয়ে যায় না। তাই আমরা এই বিষয়ে আলোচনাটি করতে উদ্যোগী হয়েছি।

হদিস:

1. Ali Shariati, Marxism and Other western Fallacies, trns. Hamid Algar, Mizan press, Berkeley, 1982.

2. Shariati and Marx: A Critique of an ‘Islamic’ Critique of Marxism, Assef Bayat, Alif: Journal of comparative poetics, No. 10. pp 19-41, 1990.


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।