বারাণ: ব্যক্তি হতে বিশ্ব, প্রতিবিম্ব ও প্রশ্ন


ওয়াহিদ সুজন
Wednesday 07 October 09

সতের বছরের লতিফ কাজ করে তেহরানের একটা কনস্ট্রাশন সাইটে। তার দায়িত্ব হেসেলের যাবতীয় কাজ করা। অন্যদের চেয়ে আরামদায়কই বলা যায়। কারণ, বাজার করা ও রান্না করা তার মূল কাজ। উপরি হিসেবে মাঝে মাঝে দুএক পয়সা পকেটে আসে। একই সাইটে ইরানীদের সাথে কাজ করে অনেক আফগান উদ্বাস্তু। যেহেতু আইনীভাবে উদ্বাস্তুদের কাজ করার সুযোগ নাই, তাই তাদের কাজ করতে হয় কম মুজুরীতে এবং শ্রম পরিদর্শক আসলে তাদের লুকিয়ে পড়তে হয়। এই রকম একজন নাজাফ। সে কাজ করতে গিয়ে মারাত্মক আহত হলে তার স্থানে কাজ করতে আসে তার ১৪ বছর বয়সী ছেলে রাহামা। সে শ্রমিকদের ভারি কাজগুলো করতে গিয়ে নানা অঘটন ঘটিয়ে ফেলে। এক পর্যায়ে সুপারভাইজার দয়াপরবশ হয়ে হেসেলের কাজটা তাকে দেয়। এতে লতিফ ক্ষিপ্ত হয়। একে তো সহজ কাজ, তার উপর দুএক পয়সা আয় হতো। সে রাহামাকে নানাভাবে উত্যক্ত করতে থাকে। নানা অঘটন ঘটানোর মধ্য দিয়ে লতিফ আবিস্কার করে রাহামা একজন নারী। তখন সে উল্টো রাহামার রক্ষক হয়ে উঠে। বিভিন্ন ঘটনার ভেতর দিয়ে লতিফ তার ভালোবাসা প্রকাশ করে। একটা ঘটনার সুত্র ধরে সকল আফগান উদ্বাস্তু চাকুরীচ্যুত হয়। রাহামা গ্রামে ফিরে যায়। লতিফ রাহামার খোজে গ্রামে যায়। অনেক খোজাখুজির পর সে রাহামার দেখা পায় এবং জানতে পারে রাহামার প্রকৃত নাম বারাণ। সে দেখে বারাণের পরিবার নিদারুন আর্থিক সংকটে পতিত। রাহামাকে পানি থেকে পাথর তোলার মতো কঠিন কাজ করতে হয়। লতিফ ঠিক করে বেনামে পরিবারটিকে সাহায্য করবে। সে তার জমানো টাকা, ধার করা টাকা, একমাত্র সম্বল আই ডি কার্ড বিক্রী করে বারাণের পরিবারকে সাহায্য করে। সেই টাকা পেয়েই বারাণের বাবা সিদ্বান্ত নেন পরিবার সমেত আফগানিস্তান ফেরত যাবেন। মুভির শেষ দৃশ্যে বারাণ ও লতিফ মুখোমুখি হয়। চিরন্তন বিরহ নিয়ে গাঢ় দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। একসময় বারাণকে নিয়ে গাড়ী দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। পরমুহুর্তে বৃষ্টি এসে বারানের পদচিহৃ মুছে দেয়।

Film makerবারাণ মুভিটি নির্মাণ করেছেন ইরানী চলচ্চিত্রকার মাজিদ মাজিদী। এই ছবির চিত্রনাট্য ও প্রযোজনায়ও তিনি আছেন। মাজিদ মাজিদীকে নিয়ে বলতে গেলে এভাবে শুরু করতে হয়, তাকে নিয়ে নতুন কিছু বলার নাই। তার পূর্ববর্তী আলোচিত দুটো মুভি হলো: কালার অব প্যারাডাইস এবং চিল্ড্রেন অফ হ্যাভেন। এই দুটি মুভির স্বাদ অতুলনীয় এবং ভুলা দুঃসাধ্য। তার এই মুভি দেখতে গিয়ে পূর্ববর্তী মুভি দুটি বার বার মনে পড়ে। মূলত: মানবিক সম্পর্কের বর্ণনা হতেই রচিত এই দুরুহ অভিজ্ঞতা-আখ্যান এবং জগতের চিরন্তন সৌন্দর্যের আকুতি। মানুষ শুধু মাত্র একটি প্রজাতিক পরিচয় নয়, তার সাথে বেশি কিছু। তাই যে কোন পরিস্থিতি বা স্থান-কালে প্রতিমুহুর্তে জীবন নানা রঙ্গে নানা ভঙ্গিমায় নিজেকে জানান দেয়, এই তো উপলব্দি, যা এই মুভিগুলোর ভিন্ন ভিন্ন চিত্রকল্পে ভিন্ন ভিন্নভাবে মূর্ত হয়।

মুভিটি দেখার আগে ধারণা পেয়েছিলাম এটি প্রেমের মুভি। পূর্বধারণা ছাড়া দেখলে মুভিটি অন্যভাবে ধরা পড়ে। বিশেষ করে, রাহামা চরিত্রের আড়ালে বারাণ যতক্ষণ ঢাকা থাকে, ততক্ষণ দর্শকের দৃষ্টি থাকে উদ্বাস্তু জীবনের সুখ-দু:খকে ঘিরে। বারাণ রাহামার আড়াল ছেড়ে বের হয়ে এলে কাহিনী নতুন গতি লাভ করে, কিন্তু তার ধারাবাহিকতা হারায় না বরং মুভির নাটকীয়তা বেড়ে যায়। শুরুতেই বলে দেয়া হয় ইরানে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন আফগান উদ্বাস্তুর বাস। উদ্বাস্তু শব্দটি দ্বারা আমরা কি নির্ধারণ করি, কিইবা বলি, সেটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবনার বিষয়। এই একটি শব্দের বাইরে তাদের কি কোন পরিচয় আছে। আমরা যখন বাংলাদেশে বসবাসকারী বিহারী বা রোহিঙ্গাদের কথা বলি সেই উত্তরটা বেরিয়ে আসে একভাবে। তাহলে আফগানিস্তান, প্যালেস্টাইন বা পার্বত্য চট্টগ্রাম যাই বলি না কেন একেকটা আলাদা প্রশ্নের সামনে দাড়ায়। তারা কি বলতে চায় অথবা কি করতে চায়। সবার মুখে কিন্তু ভাষা ফুটে। অথবা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া একজন বাংলাদেশীর স্বপ্ন কি ছিলো, যদিও সবগুলো ঘটনা আলাদা আলাদা কিন্তু বর্ণনার সংকটে নাম পরিচয় একই। মোটাদাগে দেখলে, নিজের মাতৃভূমিতে চ্যুত হয়ে পরভূমে বসবাস। এর আবহে থাকে রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় সংঘাত। আবার একজন উদ্বাস্তু চাইলে সে ইতিহাস ঐতিহ্য থেকে বের হতে পারে না, যার পরশ তার শিরায় শিরায়। তাই উদ্বাস্তু প্রতœবস্তু নয়। বরং জীবন্ত ইতিহাস। এক ইতিহাসকে ধারণ করে অন্য ইতিহাসের সাথে যুক্ত হয়, কিন্তু খুজে চলে হারান সুত্র। ব্যবিলনে নির্বাসিত ইহুদীরা কি করেছে? তারা সেই ইতিহাসকে যুক্ত করেছে নতুন ইতিহাসে। তাই এ মুভি বুঝি দেখি ক্রমাগত ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে আফগান উদ্বাস্তু বাধ্যবাধকতা হোক, অন্যকোন কারণে হোক নিজ নিজ স্বতন্ত্র ভাষা বা সংস্কৃতির অনুশীলন দেখি আবার দেখি বেচে থাকার তাগিদে মূল জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে যাবার কাঙ্ক্ষা। এটা তো বড় ধরনের মনোস্তাত্ত্বিক বাধা, যেখানে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন স্থবির করে দেয়। কিন্তু এর উপরই টিকে থাকে বাস্তচ্যুতের বেচে থাকার ভিত্তি। মাজিদীর চিন্তা সহজভাবে বুঝতে না পারলেও এখানে স্পষ্টত: মানুষের ভিন্নতার আলাদা দ্যোতনা আবশ্যক হয়ে উঠে।

এই মুভিতে মানুষের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় এবং সাতন্ত্র্যতাকে আলাদা গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। একে শুধুমাত্র উদ্বাস্তু কেন্দ্রিক মুভি মনে করলে চলবে না। ইরানে বসবাসকারী ৫১% পারসিয়ান, ২৪% আজেরী, ৮% গিলাকী এবং মাজানদারানী, ৭% কুর্দী, ৩% আরব, ২% লুর, ২% বালুচ, ২% তুর্কী এবং ১% অন্যান্য। এদের ইতিহাস আলাদা, চিন্তা আলাদা, ভাষাও আলাদা। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভেতর আমরা তাদেরকে ক্রমাগত এক করে ফেলি। হয়তো মাজিদী সেই ভুল ভাঙ্গিয়ে দিতে চান। এই মুভিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ পারসিয়ানদের কোন চরিত্র নাই। সম্ভবত: শ্রম পরিদর্শকদ্বয় এ দলে। এই কাহিনী শুধু উদ্বাস্তুই নয়, বরং একটি পরিচয় কতটা বিভক্তির ভেতর দিয়ে এক হয়ে উঠে আবার পরস্পরের সাথে সম্পর্ক অনুভব করে--এগুলোর আড়ালে মূল প্রকরণ রাষ্ট্রীয় চরিত্র। এই মুভির ঘটনা প্রবাহে সংখ্যাগরিষ্ঠর দেখা মেলে না। এর মধ্যে কোন মেসেজ থাকতেও পারে, আমি ওয়াকিবহাল নয়। তবে এটা সত্য যে, এখানে মানুষের সর্ম্পকটাই আসল। এটা আমরা অনুভব করি এবং এ সম্পর্কই আমাদের মুগ্ধ করে এবং টিকিয়ে রাখে । এর আলাদার গুরুত্বের কথা এজন্য আসছে যে, ইরানের জনবিন্যাস সর্ম্পকীয় তথ্য মাজিদ মাজিদীর অফিসিয়াল সাইট হতে পাওয়া। এইখানে স্পষ্টতঃ কিছু রাজনীতি কাজ করেছে।

এই মুভি সর্ম্পকে যে কয়টা রিভিউ পড়লাম, সব জায়গায় একই ইন্টারপ্রিটেশন, এটি প্রেমের মুভি। কেমন যেন মনে হয় বাজারী চিন্তা হতে এমন মূল্যায়ন। বারাণ শব্দটির অর্থ বৃষ্টি। মুভির শেষে দেখি বৃষ্টিতে বারাণের পদচিহ্ন মুছে যায়। তখন এই লোভটুকু জাগে- আহা এইভাবে যদি দু:খ যাতনাগুলো মুছে যেতো। লতিফ চরিত্রটি অদ্ভুত। সামাজিক অসাম্য এই চরিত্রটির মধ্য দিয়ে স্পষ্ট। তার স্বার্থপরতা ও জেদের মধ্য দিয়ে তা আরো জোরালো হয়ে উঠে। কিন্তু সে স্বভাবত: নিজেকে অন্যভাবে প্রকাশ করতে চায়। যেমন- লতিফের একান্ত আনন্দময় সময় কাটে সে যখন কবুতরদের খাবার দেয়। এখানে সে প্রত্যাহিক খোলস হতে বেরুতে চায়। যেখানে আসলেই নিজের চাওয়াকে পূর্ণ করতে পারে। একসময় এই লতিফই তার সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে আনন্দ পায়। হয়তো এইখানেই তার বেচে থাকা। এটা কোন নির্দিষ্ট দেশ-কালের ঘটনা না, বরং মানবিক তৎপরতা মূর্ত হয়ে উঠে। তখনই প্রশ্ন জাগে মানুষ স্বভাবতঃ স্বার্থপর-- এই ধারণা সত্ত্বেও কি করে আমাদের আনন্দময় জগতটা তৈরি হয়। নাগরিক জীবনের যুক্তিগ্রাহ্যতা এখানে অর্থহীন। কারণ, সে যখন অন্যের জন্য জেগে উঠে তখন আমি কি পেলাম, এই ধরণের প্রশ্ন অস্বাভাবিক। এখানে সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক, দৈশিক ভেদ গুচে যায়। তখনই জগতে পরম ধরা দেয়। যতই কষ্ট জাগুক বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে রোদ্দুরময় হয়ে উঠে পৃথিবী। কিন্তু, তারপরও কি বাকি পৃথিবী তার ভেদের স্থান হতে ন্যুনতম এক কদম পিছু হঠে? অবশ্যই হঠে। এটা হয়তো যুক্তির জায়গায় সহজে ধরা পড়ে না, কিন্তু মানুষ অনুভব করে। লতিফ চরিত্রে হোসাইন আবেদিনি অবিশ্বাস্য দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার অভিনয়ের ব্যাপক সুযোগ ছিল, তিনি তা পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন।

এই মুভির কাহিনীর পেছনকার ক্যানভাস বিশাল, কিন্তু দেখানোর জায়গাটা বেশ আটোসাটো। দৃশ্য নির্মাণ ও চিত্রায়নে তাই বিশাল দৃশ্যপট হাজিরের সুযোগ কম ছিলো। কিন্তু যে কয়টা সুযোগ এসেছে, তা পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন। যেমন- শ্রমিকদের সারিবদ্ধভাবে কাজ করা, বারাণের গ্রামের দৃশ্য হতে দৃশ্যান্তরে যাওয়া, গোরস্থানের একটি দৃশ্য অথবা লতিফের একান্ত ভূবন ছাদ হতে বাহিরের দৃশ্য দেখানো অথবা যখন লতিফ বারাণকে বাচাতে বেপরোয়াভাবে শ্রম পরিদর্শকদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। শ্রমিকদের কাজ করার দৃশ্য নিয়ে কিছু কথা বলা যায়। মাজিদী সৌন্দর্যকে তুলে ধরতে চান। তাই সাইটের একঘেয়ে দৃশ্যগুলোও একের পর এক চমৎকার আবহে হাজির হয়। নাকি এর ভেতর দিয়ে তিনি জীবনের কথা বলতে চান- যা শ্রম আর ঘাম দিয়ে তৈরি। যা সকল সৌন্দর্যকে, শিল্পকে বাচিয়ে রাখে। সে কারণে শহর হতে গ্রামের দৃশ্যে প্রবেশ একই ধারাবাহিক দ্যোতনা সৃষ্টি করে। নান্দনিকতা, স্থিরতা, সৌন্দর্য, সৌম্যতা জেগে উঠে। মানুষের জন্য সকল স্থানই পবিত্র। পরিহাস। এখানে মানুষে মানুষে পার্থক্য সমাজ স্বীকৃত। এই মুভিতে মাজিদী সযতœ হিউমারের ব্যবহার করেছেন। এই ছোট ছোট দৃশ্যগুলো দিয়ে বুঝা যায় জীবনের প্রকাশ কতো সজীব।

বারাণের ছোট ছোট কিছু আবেদনময় দৃশ্য আছে, যেমন- চুল আছড়ানো, লতিফকে দরোজা খুলে দেয়া, দুধ উৎসবের দৃশ্য ইত্যাদি। বারাণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাহরা বাহরামী। সংলাপহীন পুরোপুরি অভিব্যক্তি নির্ভর চরিত্র। তিনি দুটো চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাহামা ও বারাণ, সফল হয়েছেন।

সংগীত পরিচালক হিসেবে আহমেদ পেজমান মুভিটিকে গতিশীল করে তুলেছেন। ট্রাডিশান পারসিয়ান মিউজিক ভালো লাগে। তাছাড়া পূর্ব থেকেই তার যথেষ্ট সুনাম আছে। মাজিদীর যে দার্শনিকতা ও নান্দনিকতা তা চিত্রগ্রাহক মোহাম্মদ দাভুদী যথার্থই ধরেছেন। ছোট খাট দুএকটা হোচট থাকতে পারে তবে তা ধার্তব্যের মধ্যে নয়। এই মুভিটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক একাধিক স্বীকৃতি পেয়েছে। সেরা মুভি, সেরা পরিচালক, বিশেষ সমালোচক, সেরা অভিনেতা, সেরা সংগীত, সেরা সংগীত ধারণ, সেরা সাউন্ড ইফেক্ট ও মিক্সিং ইত্যাদী মিলিয়ে আবাদান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ইরানিয়ান সিনেমা ক্রিটিকস ও ইরানে অনুষ্ঠিত ১৯তম ফেয়ার ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে মোট ৯টি পুরস্কার লাভ করে। অপরদিকে Freedom Of Expression Award, সেরা চিত্রনাট্য, সেরা পরিচালক, The Oslo Films from the South Award (Best Film), Oecumenical Special Award, Grand Prix Des Ameriques সহ মোট ৭টি পুরস্কার পেয়েছে National Board of Review New-York USA, Gijon Film Festival, 25th Montreal Film Festival ইত্যাদি ফেস্টিভ্যালে । সেরা বিদেশী মুভি হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছে European Film Awards I Golden Satellite Award ফেস্টিভ্যালে।

View: 3503 Posts: 0 Post comments

Home
EMAIL
PASSWORD