ফিদা হাসান


Sunday 07 November 10

print

রাজনৈতিক ঘটনাবলী দেখবার ও বিচার করবার নানান দৃষ্টিভঙ্গি স্বাভাবিকভাবে অন্য যে কোন দেশের মতো বাংলাদেশেও আছে। ঘটনার ধারাবাহিকতা বা ছেদ দেখা, ধরতে পারা ও বিচার করবার ক্ষমতা একটি জনগোষ্ঠি সহজে অর্জন করে না। তবুও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি, শেখ মুজিবের হত্যা ও মোস্তাকের হাত ঘুরে জিয়ার হাতে ক্ষমতা থিতু হয়ে বসার প্রতি বাংলাদেশের নানান শ্রেণী ও শক্তির দৃষ্টিভঙ্গী আমরা টের পাই। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত একদল আইনি পেশার লোকজন আছেন যারা শুধু একটা দৃষ্টিভঙ্গিই তৈরি করে বসে নাই, দলীয় ও শ্রেণীগত জায়গা থেকে তারা তাদের সুনির্দিষ্ট করণীয় ও পদক্ষেপ সততই ঠিক করছেন এবং সে কাজের ব্রতে তারা সক্রিয়ও বটে। আমরা বিশেষভাবে তাদের প্রতি নজর দিচ্ছি যাদের তৎপরতা মূলত ড্রয়িংরুম ভিত্তিক; সুনির্দিষ্ট কোন নাম নাই কিন্তু একটা দলবদ্ধ গ্রুপ আকারে তাদের আমরা দেখি। এমন একটা গ্রুপের কথাই এখানে উল্লেখ করব। বারবার এদের কথা এখানে বলার সুবিধার জন্য এর নাম আমরা ধরে নিলাম ‘মিশন এক্স’। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আছেন বর্তমান প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজ (যিনি পারিবারিক সূত্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির স্বামী), সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, ব্যারিস্টার আজমামুল হোসেন কিউসি এবং আরো অনেকে। তাদের পেশাগত ও রাজনৈতিক তৎপরতা উভয় দিক থেকে স্পষ্ট করেই চেনা যায়। মিশন এক্সের চিন্তা ও প্রচেষ্টার মধ্যে অবশ্য আরও অনেকে আছেন যাদের পরিষ্কার করে চেনা যায় না। এছাড়াও অন্য অনেকে আছেন যারা মিশনের চিন্তা, প্রকল্প এবং তা বাস্তবায়নের পথে সাথে জড়িয়ে গেছেন, এরা মিশন এক্স এর ঠিক মূল গ্রুপের না; যেমন আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রমুখ। এদের নাম উল্লখে করে কোন ষড়যন্ত্রের কথা আমি বলতে বসি নাই। মিশন ‘এক্স’ কোন ষড়যন্ত্রের নাম না। এদের চিন্তাটা যেরকম কাজে তার প্রকাশটাও সেরকমই। এসব বিষয় নিয়েই এখানে কথা বলবার প্রসঙ্গ। সারকথায়, মিশন এক্স এর চিন্তা ও তৎপরতার পর্যালোচনাই এই লেখার বিষয়।

পঞ্চম সংশোধনী বাতিল মামলাকে কেন্দ্র করে মিশন এক্স এর তৎপরতা জনসমক্ষে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে। ‘পঞ্চম সংশোধনী বাতিল মামলা’ বললাম বটে কিন্তু আদালতের কাগজপত্রের ভাষায় এটা মুন সিনেমা হল মামলা। এই মামলা শেখ মুজিবের আমল থেকে শুরু করে জিয়ার আমলে চলে আসে। এরপর তা পেরিয়ে শেষের দিকে প্রায় একরকম মৃতপ্রায় অবস্থায় ছিল মামলাটি। এই মামলাকে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল মামলা হিশাবে কাজে লাগানোর প্রয়োজনে যেনবা একরকম কিনে নেয়া হয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে অন্য অনেক অবাঙালীর পরিত্যক্ত সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে নেয়া হয়েছিল। যেমন, বাংলাদেশের কনস্টিটিউশন প্রণীত হবার আগেই অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলামের এক ডিক্রি বলে (অস্থায়ী রাষ্ট্র্রপতি আদেশ নং ১, ডিসেম্বর ৩১, ১৯৭১) সরকারি মালিকানাধীন সম্পত্তি বলে অনেক সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে নেয়া হয়েছিল; মুন সিনেমা হল সেরকমই এক সম্পত্তি। অধিগৃহীত এই সম্পত্তি পরে সরকার থেকে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে হস্তান্তর করে দেয়া হয়েছিল।

পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে শেখ মুজিব দেশে ফিরে আসেন ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সনে । তিনি রাষ্ট্রপতি হিশাবে আসীন হবার আগে থেকেই মুন সিনেমা হল মামলার ঘটনা-উপাদান শুরু হয়েছিল। এরপর ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাস থেকেই ওই সম্পত্তি ফেরত পাবার জন্য মূল মালিক বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ঘুরে সরকারি অফিসে লিখিত আবেদন নিবেদন শুরু করেছিলেন। শেখ মুজিবের শাসনের সময় থেকেই এবং তার মৃত্যুর পরও নানান কায়দা কানুন, আইনের ফাঁক ফোকর গলে, শিল্প মন্ত্রণালয়কে হাত করে এমনি বহু পরিত্যক্ত সম্পত্তি ফেরত নেবার এক জোয়ার উঠেছিল। মুন সিনেমা হল মালিকের এরকম এক আবেদনের প্রেক্ষিতে ২২ অক্টোবর ১৯৭৩ সালে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ‘পরিত্যাক্ত সম্পত্তি সেল’ ঢাকা জেলা প্রশাসনকে মাঠ তদন্ত করে রিপোর্ট পাঠাতে বলে। জেলা প্রশাসন মাঠ তদন্ত শেষে প্রায় বছর খানেক পরে ‘পরিত্যাক্ত সম্পত্তি সেল’ কে রিপোর্ট দেয়। ঐ সম্পত্তি ‘পরিত্যাক্ত সম্পত্তি নয়’ ফলে তা ফেরত দেয়া যেতে পারে বলে সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ জানায় ঐ রিপোর্ট। কিন্তু ঐ মাঠ রিপোর্ট ও সুপারিশ অবজ্ঞা করে শিল্প মন্ত্রণালয় ২৭ জুন ১৯৭৫ সালে ওই সম্পত্তি ‘পরিত্যাক্ত সম্পত্তি” বলে প্রাক্তন মালিককে চিঠি দিয়ে জানিয়ে সব আবেদন নাকচ করে দেয়।

এখান থেকে এই ঘটনা আদালতের ইস্যু হবার দিকে মোড় নেয়। মুন সিনেমা হল মালিক ১৯৭৬ সালে সম্পত্তি ফেরত পাবার আদেশ কামনা করে হাইকোর্টে রিট করেন। রিট দায়েরের প্রায় এক বছর পর ১৯৭৭ এর ১৫ জুনে হাইকোর্ট তার রায়ে মন্ত্রণালয় ও কল্যাণ ট্রাস্টকে সম্পত্তি ফেরত দিয়ে দেবার নির্দেশ জানিয়ে রিট নিষ্পত্তি করেন।

কিন্তু মুন সিনেমা হল মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের মালিকানায় দখলে থাকার কারণে ওই রায়ের প্রেক্ষিতে সম্পত্তি ফেরত দেবার বদলে শিল্প মন্ত্রণালয় উল্টা কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষে মালিকানা ধরে রাখতে সরাসরি রাষ্ট্রপতি জিয়ার পৃষ্টপোষকতা চায়। ফলে ঘটনা কোর্ট কাচারিতে শেষ হবার পরও জিয়াকে দিয়ে Abandoned Properties (Supplementary Provisions) Regulation, 1977 নামে এক আইন জারি করা হয় যাতে কোর্টে মামলার তর্কবিতর্ক ও রায় যাই হোক তা এড়িয়ে কল্যাণ ট্রাস্ট সহজেই মালিকানা ধরে রাখতে পারে। স্বভাবতই জিয়ার ওই আইন জারির ক্ষমতার উৎস সামরিক আইন। তবে অনুমান করা যায় ওটা মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যাপার। কাজেই মুক্তিযোদ্ধামূলক সেন্টিমেন্টের কবলে পড়ে প্রেসিডেন্ট জিয়া ওই সামরিক আদেশে আইন জারিতে প্ররোচিত হয়েছিলেন। কিন্তু বিধিবাম। মুক্তিযোদ্ধামূলক সেন্টিমেন্টের কবলে পড়াই জিয়ার জন্য কাল হয়েছিল। কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষে মালিকানা ধরে রাখতে রাষ্ট্রপতি জিয়ার ওই আইন জারি পরবর্তীকালে মিশন এক্স এর পঞ্চম সংশোধনী বাতিল প্রকল্প ও তা বাস্তবায়নের উপায় হিশাবে হাজির হয়ে যায়।

১৯৯৪ সালে ওই সম্পত্তি ফিরে পাবার উসিলায় নতুন এক রিট মামলা হয়; এই মামলায় আগের ওই মালিকানা বিষয়ক মামলাকে কনস্টিটিউশনাল মামলার ইস্যু হিশাবে হাজির করা হয়েছিল। যেখানে ইস্যু হল জিয়ার ১৯৭৭ সালের ওই আইন জারির কনস্টিটিউশনাল এখতিয়ার ছিল কিনা। অর্থাৎ জিয়ার ১৯৭৫ সালের ক্ষমতা গ্রহণের বৈধতা ও প্রেসিডেন্ট হিশাবে কোন আইন জারির ক্ষমতা আদৌ ছিল কি না। এই হল মুন সিনামা হল মামলা। মানে একটি মালিকানা বিষয়ক সিভিল মামলাকে কনস্টিটিউশনাল মামলার ইস্যু হিশাবে রূপান্তর ঘটিয়ে নতুন করে হাজির করা। সোজা কথায় তখন থেকে এই মামলা জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ বৈধ কি না সেই সাংবিধানিক তর্কের ফাঁদে পড়ে যায়। অর্থাৎ পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের মামলা হয়ে দাঁড়ায়।

পঞ্চম সংশোধনী বাতিল আমাদের নিজেদের দেয়া নাম। আইনগত ভাষায় এটা এখনও মুন সিনেমা হল নামক সম্পত্তি ফেরত পাবার সিভিল তথা দেওয়ানী মামলা। সরাসরি কোন কনস্টিটিউশনাল মামলা না। অর্থাৎ সরাসরি কনস্টিটিউশনের পঞ্চম সংশোধনী আইন অবৈধ ঘোষণা করার দাবি জানিয়ে হাইকোর্টে দায়ের করা কোন রিট মামলা না; যেগুলোকে আমরা রাজনৈতিক মামলা বলে বুঝি।

এটা স্পষ্ট যে কেবল একটি সম্পত্তি ফেরত পাবার উদ্দেশ্য দায়ের করা সিভিল মামলা মিশন এক্সের আগ্রহ না। কারও সম্পত্তি উদ্ধার করার মধ্য দিয়ে মিশন এক্সের কোন রাজনৈতিক প্রকল্প খাড়া হতে পারে না। তবে এই মামলাকে কেন্দ্র করে কনস্টিটিউশন মামলা হিশাবে ঘুরিয়ে তা হাজির করার সুযোগ আছে। সেই দিকটাকে কেন্দ্র করেই মিশন এক্সের মিশনের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

কোন সিভিল মামলাকে কনস্টিটিউশনাল মামলা হিশাবে হাজির করার সুযোগ থাকলে সেই সুযোগ নেওয়া দোষের কিছু না। তবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে করণীয় মনে করার কারণে সরাসরি পঞ্চম সংশোধনী আইন বাতিল দাবি করে মিশন এক্স তার প্রকল্প হাতে নেয় নাই; এটাই এখানে লক্ষণীয় বিষয়। এখান থেকেই মিশন এক্স এর কাজকর্মের ধরন, রাজনৈতিক উদ্দশ্যে, আর কাজের উপায় বেছে নেয়া ইত্যাদি তৈরি হয়েছে। মিশন এক্স  কিভাবে তৎপর হতে পছন্দ করে তারও একটা হদিস আমরা এখান থেকে পাই। কারণ, পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের ইস্যুটা আগাগোড়াই একটা রাজনৈতিক ইস্যু। সরাসরি রাজনৈতিক লড়াই কিম্বা গণআন্দোলনের ভেতর দিয়ে তৈরি ক্ষমতার জায়গা থেকে বিদ্যমান আইনকে মোকাবেলার পথে তারা যায় নাই। চাতুর্যের সাথে রাজনৈতিক এজেন্ডাকে স্রেফ আইনি ইস্যু হিশাবে তুলে আদালতে অগ্রসর হবার কৌশল মিশন এক্স কাজে লাগায়। আদালতের করিডোরে ফয়সালার আবরণে প্রভাব তৈরি করে জিতে আসা মিশন এক্স এর প্রকল্প। এটাই তাদের পছন্দের পথ। তাও রাজনৈতিক প্রশ্নে সরাসরি কনস্টিটিউশন মামলা হিশাবে না, কোন এক সম্পত্তি ফেরত পাবার সিভিল মামলার উসিলায়। সন্দেহ নাই এটা অনেকটা গরুর রচনা লিখার নামে গরুকে নদীতে ফেলে এবার নদীর রচনা লেখার মতন ব্যাপার।

যেকথা থেকে শুরু করেছিলাম -- বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি, শেখ মুজিবের হত্যা ও মোস্তাকের হাত ঘুরে জিয়ার হাতে ক্ষমতা থিতু হয়ে বসা ইত্যাদি ঘটনাবলী দেখার ও বিচারের নানান দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে আছে। এর মধ্যে স্বভাবতই আওয়ামী ড্রয়িংরুমের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলোও অন্তর্ভুক্ত। মিশন এক্স এমনই এক আওয়ামী বৈঠকখানার দৃষ্টিভঙ্গি।

এসব বৈঠকখানাগুলার চিন্তার বৈশিষ্ট্যসূচক কিছু দিক আমরা চিহ্নিত করার চেষ্টা করতে পারিঃ

বৈশিষ্ট্য এক: এরা ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশনের ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ প্রেমী

১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশন, আইন, রাষ্ট্র্র এবং ওই সময়ের শেখ মুজিবের রাষ্ট্র্রশাসন সব কিছুকেই বাংলাদেশের জন্য এরা স্বর্ণযুগ মনে করে, মনে করে এ এক  মহা অর্জন এবং অনন্য সাধারণ দৃষ্টান্ত। সেই সময়কে সিনেমার অভিনয়ের মত পুনরুৎপাদন করে বারবার হাজির করাটা এদের প্রত্যেকের জীবন-সাধনা; তাদের রাজনৈতিক অভিলাষের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য রাজনৈতিক স্বপ্ন-কামনা। এই কামনা-বাসনার কেন্দ্র হল ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশন অর্জন। মিশন এক্সের কাজ একে দুনিয়ার এক অনন্য সাধারণ, অদ্বিতীয় ও পবিত্র ঘটনা বলে জাহির করা। এই ভাবটা ধরা পরে এদের একটি ছোট্ট শব্দ ব্যবহারে। সেটা হোল,  ‘বেসিক স্ট্রাকচার বা মূল কাঠামো’। তাদের দাবি জিয়া পঞ্চম সংশোধনী আইন জারি করে ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশনের ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ ভেঙ্গেছেন। জিয়ার বিরুদ্ধে শানিত অভিযোগ এই ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ নামে  আমদানি বয়ানের অপর দাঁড়ানো। আওয়ামী ড্রয়িংরুমের এই ভাবনায় মনের কথাটা গুছিয়ে বলা সর্বশেষ উচ্চারণ আমরা পাই প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের শপথ-উত্তর সাংবাদিক কথোপকথনে। তিনি বলছেন,  ‘জাতীয় সংসদ আইনগতভাবে সংবিধানের মূল কাঠামো ব্যতীত যেকোন পরিবর্তন আনতে ক্ষমতাবান। মূল কাঠামো হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক চরিত্র, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ইত্যাদি’। কথাগুলা আমাদেরকে এখানে ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখতে হবে। অনেকবার কথা বলতে হবে এই বাঁধানো বক্তব্য নিয়ে। তবে তার আগে এখন এই প্যারাতে উঠে আসা আওয়ামী বৈঠকখানার রাজনৈতিক স্বপ্ন-কামনা প্রসঙ্গে কথা শেষ করে নিতে চাই।

ভাল মন্দ যাই হোক পুরনো স্মৃতি আমাদের তাড়িত করা স্বাভাবিক। কিন্তু তা আঁকড়ে সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে বসে থাকা কোন কাজের কথা না। সেটা হবে বাস্তবতা ফেলে রচিত স্বপ্নের দুনিয়ায় বসবাস করা। নিজের জীবনের এটা নতুন সমস্যা। নতুন প্রয়োজন, নতুন পরিস্থিতি নিয়ে নিজে কি করতে চাই সে সম্পর্কে বেখবর থাকা। মিশন এক্সের বৈশিষ্ট হলো পুরানা স্মৃতি আগলে বসে থাকা, থাকতে পছন্দ করা। পারলে পুরানাকেই তার ভুলশুদ্ধ সহ আবার হাজির করা। অথচ স্মৃতির ভুমিকা এতটুকুই যে ও থেকে জীবনের নতুন প্রণোদনা সংগ্রহ করাই কাজ। এখনকার করণীয় টের পাওয়া, পুরনো সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া ও সামনে এগিয়ে চলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাথেয় হিশাবে পুরানাকে সঙ্গী করা চলে। কিন্তু পুরানাকে আঁকড়ে ধরে রাখলে চলে না। এককথায় স্মৃতিকে পর্যালোচনার বিষয় হিশাবে নেয়ার সাহস দেখানোই কাজ।

মিশন এক্স এর সেই সাহস এবং সেই মনোভাব নাই। এই মনোভাব কোন চ্যালেঞ্জ ছাড়া ধরে নেয় ও ভাবতে ভালবাসে যে শেখ মুজিবের আমল এমনই এক স্বর্ণযুগ যেখানে কোন খামতি নাই, চিন্তার ত্রুটি নাই, ব্যর্থতা নাই, অযোগ্যতা নাই, পরাজয় নাই কেবল অর্জন আর অর্জন। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, সে বুঝতে পারে না এবং সেই বুঝাটা চিন্তার সাহসেও কুলায় না যে, যদি তাই হয়, তাহলে সেই যুগটা নিজে টিকে থাকতে পারল না কেন? ফলে এরা না টিকে থাকার কারণ হিশাবে বড়জোর ষড়যন্ত্রই দেখতে পায়।

মিশন এক্সের এই বৈশিষ্ট্যের সারকথা হল, সবকিছু পুনর্বিচার ও পর্যালোচনার আওতায় আনতে ভীতসন্ত্রস্ত হওয়ার মনোভাব। কেন শেখ মুজিবের শাসন যদি ‘স্বর্ণযুগ’ তবে কেন তার পতন ঘটেছিল তার ক্রিটিক্যাল বিচার, আত্মপর্যালোচনামূলক চিন্তার সাহস ও ক্ষমতা এদের নাই। যেন সেকাজে নামলে শেখ মুজিবের প্রতি ভক্তের অশ্রদ্ধা প্রকাশ হয়ে যাবে। এরাই ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশনের ‘বেসিক স্ট্রাকচার বা মূল কাঠামো’র ভক্তপ্রেমিক। এই ভক্তরা এতই অন্ধভক্ত যে খোদ শেখ মুজিবই যে সবার আগে ‘বেসিক স্ট্রাকচার বা মূল কাঠামো’ আস্ত রাখে নাই, বরং তুলে আছাড় মেরেছিলেন সে খবর নাই। সে খবর তারা রাখতে চায় না, সাহস করে না। আগেই জানিয়েছি প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের বেসিক স্ট্রাকচার বিষয়ক মহাবয়ান সদ্য তাঁর শপথ-উত্তর এক সাংবাদিক কথোপকথনে, আদালতের কোন রায় নয় বিধায় এখন শুধু একটা প্রশ্ন তুলে প্রসঙ্গে ঢুকব।

ওই সাংবাদিক কথোপকথনে বেসিক স্ট্রাকচার বলতে তিনি কি বুঝেন অর্থাৎ তাঁর সংজ্ঞা নিয়ে আমাদের ভুল বুঝাবুঝির অবকাশ যাতে না থাকে সেজন্য আমাদের জানিয়ে বলেছেন, ‘মূল কাঠামো হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক চরিত্র, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ইত্যাদি’। তাঁকে ধন্যবাদ জানাই, খুবই ভাল একটা কাজ করেছেন সন্দেহ নাই। আমাদের এখন কথা বলতে আরাম হবে।

এখন প্রশ্ন হলো, প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক কী মনে করেন কনষ্টিটিউশনের চতুর্থ সংশোধনী আইন বাকশাল জুড়ে দেবার পরও শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের কনষ্টিটিউশনের বেসিক স্ট্রাকচার অক্ষুন্ন রেখেছিলেন? আনপ্যারালাল, অদ্বিতীয় ও পবিত্র পুস্তক ১৯৭২ সালের কনষ্টিটিউশনের মূল কাঠামো রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক চরিত্র, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ইত্যাদি এরপরেও কি রক্ষা পেয়েছিল ও বজায় ছিল?

সকলকে মনে করিয়ে দেই,

১. চতুর্থ সংশোধনী আইন ১৯৭৫-এ কনস্টিটিউশনের ষষ্ঠভাগে ‘ষষ্ঠভাগ ক, জাতীয় দল’ বা বাকশাল বলে এক নতুন অনুচ্ছেদ ঢুকানো হয়েছিল। এছাড়া ওই সংশোধনীতে কনস্টিটিউশনের অনুচ্ছেদ ১১ সংশোধন করে বলা হয়েছিল, ‘Effective  participation by the people through their elected representatives in administration at all levels shall be ensured’ shall be omitted’। যার বাংলা করলে দাঁড়ায় সংশোধনের আগের কনস্টিটিউশনের অনুচ্ছেদ ১১ তে প্রশাসনের সর্বস্তরে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণের যে কথা বলা ছিল এখন তা বাতিল করে দেয়া হল। এরপরেও কি প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক এর মূল কাঠামো ধারণার ‘রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক চরিত্র’ অটুট ছিল? নাকি তা থাকতে পারে?

২. সংক্ষুব্ধ কোন নাগরিকের আদালতে যাবার যে মৌলিক অধিকার ৪৪ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত ছিল বাকশাল সংশোধনীতে খোদ সেই ৪৪ অনুচ্ছেদকেই বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে। সেই সাথে ১০২ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টেকে দেওয়া অধিকার অর্থাৎ সংক্ষুব্ধ কোন নাগরিকের আবেদন শুনতে এবং প্রতিকার দিতে নির্বাহি বিভাগের ওপর আদেশ দেবার আদালতের যে ক্ষমতা সেই ক্ষমতাকেও একইসাথে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। সারকথায়, চতুর্থ সংশোধনী আইন ১৯৭৫  ঘোষণা করেছিল আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষমতা নাই । এরপরেও কি প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের সংবিধানের ‘মূল কাঠামো’ ধারণার অন্তর্গত ‘আইনের শাসন’ বাকশালী রাষ্ট্রে ছিল কি? শুধু তাই না, আরও মারাত্মক ব্যাপার হল, খোদ সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যালোচনা কনস্টিটিউশনে প্রদত্ত ক্ষমতা হিশাবে আর কানাকড়িও অবশিষ্ট নাই এই ধরণের কোন ঘোষণা সংবিধানের সংশোধনী আকারে র্কাযকর করার এখতিয়ার বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কারও আছে নাকি থাকতে পারে? বাস্তবে কিন্তু এমনটাই ঘটেছিল। অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছিল নাগরিকদের জন্য উচ্চ আদালত। তছনছ হয়ে যায় তথাকথিত রাষ্ট্রের ‘মূল কাঠামো’, তথা প্রধান তিনটি বিভাগের মাঝে সর্ম্পকের গণতান্ত্রিক ভিত্তিমূল। এরপরেও কি বলা যায় বাংলাদেশে রাষ্ট্র্র ও কনস্টিটিউশন বলে কিছু ছিল?

কোন রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশন যদি দাবি করতে চায় সে ‘প্রজাতান্ত্রিক চরিত্র’ অর্জন করেছে এবং ‘আইনের শাসন’ সে জনগণকে দিতে পারবে তবে তার প্রথম শর্ত হল ওই কনস্টিটিউশন সুপ্রিমকোর্টকে বিচারিক পর্যালোচনার পূর্ণ ক্ষমতা দিয়েছে কি না। এটাই আগে পরখ করতে হবে। জনগণ প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের র্কাযবিধি চূড়ান্ত করে কনস্টিটিউশনে, এটা জনগোষ্ঠীর নিজেদের মধ্যকার একটা বোঝাবুঝির দলিল; একমাত্র তার ভিত্তিতেই জনগণ কোন নির্বাচিত শাসককে শাসন পরিচালনার সীমা-এখতিয়ার দেয়। এখন শাসক সেই সাংবিধানিক এখতিয়ারের মধ্যে থেকে শাসন পরিচালনা, আইন প্রণয়ন করছে কি না তা বিচার করে দেখার ক্ষমতা হল সুপ্রিমকোর্টে। এই ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট জুডিসিয়াল রিভিউ’র পূর্ণ ক্ষমতা রাখে। এই অর্থে সুপ্রিমকোর্ট কনস্টিটিউশনের হেফাজতকারী। সুপ্রিমকোর্টকে বিচারিক পর্যালোচনার পূর্ণ ক্ষমতা কোন শাসক কেন, কেউই ছিনিয়ে নিতে পারে না। ছিনিয়ে নিয়েছি দাবি করা আবার ছিনিয়ে নেয়া কথা লিখে একটা আইনও (চতুর্থ সংশোধনী আইন) জারি করা হয়েছে তাই যদি অবস্থা হয়, তবে নিঃসন্দেহে তখন থেকে ওই কনস্টিটিউশন বা রাষ্ট্র অবলুপ্ত হয়ে গেছে। কারণ তখন তা ঐ শাসক বা শাসকগোষ্ঠীর কাছে যেমন খুশি কাঁটাছেড়া করার বস্তুতে পরিণত হয়। বাংলাদেশে র্কাযত, জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের জায়গায় প্রজাতন্ত্রের বদলে শেখ মুজিব নামে এক রাজার শাসন কায়েম হয়ে গেছে। প্রজাতন্ত্রের জায়গায় কায়েম হয়ে গিয়েছিল রাজতন্ত্র। নাগরিকরা যে ক্ষমতা শাসককে দেয় নাই সে ক্ষমতাই সে আইন বলে দাবি করছে। আবার ওদিকে খোদ চতুর্থ সংশোধনী আইন কনস্টিটিউশনের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে গেলেও তা নিয়ে সুপ্রিমকোর্টের কাছে নালিশী রিট করে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ নাই বা রাখা হয় নাই। কারণ সুপ্রিমকোর্টের বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষমতা নাই বলে দেয়া হয়েছে। ফলে চতুর্থ সংশোধনী আইন বিশুদ্ধ রাজতান্ত্রিক আদর্শ হিশাবে হাজির হয়েছে, একটা রাজার শাসন কায়েম হয়েছে ঐ বিধানের মধ্য দিয়ে, কনস্টিটিউশনাল রাষ্ট্র্র বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে নি। রাজাই সার্বভৌম, শেখ মুজিবই রাজা। প্রজাতন্ত্রের খোলসটা বজায় রেখে চতুর্থ সংশোধনী এক রাজার রাজত্বই কায়েম করেছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যালোচনার পূর্ণ ক্ষমতা আছে কি না এটা যে কোন কনস্টিটিউশনাল রাষ্ট্রেরই মূল কথা। বেসিক স্ট্রাকচার যদি অর্থপূর্ণ কোন নালিশ উঠানোর জায়গা হয় তবে তাকে তুলতে হবে এই জায়গা থেকে। এখান থেকে আমরা সোজা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি, যে কোন কনস্টিটিউশনাল রাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের জুডিসিয়াল রিভিউ’র পূর্ণ ক্ষমতা নাই এটা হতে পারে না। সুপ্রিম কোর্টের জুডিসিয়াল রিভিউ’র পূর্ণ ক্ষমতা নাই একথার একটাই মানে হল রাষ্ট্রের প্রাণভোমরা বেরিয়ে গেছে, এখন রাষ্ট্র্রও নাই, তার কনস্টিটিউশনও নাই; সবই অবলুপ্ত হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক সুপ্রিম কোর্টের এই ক্ষমতা এবং জুডিসিয়াল রিভিউ’র পূর্ণ এখতিয়ার কেন গুরুত্বপূর্ণ তা আমাদের চেয়ে ভাল বুঝবেন।     

৩. চতুর্থ সংশোধনী আইনে আগের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি বরখাস্ত করার একচেটিয়া সীমাহীন কর্তৃত্ব প্রেসিডেন্টের হাতে দিয়ে বলা হয়েছিল প্রেসিডেন্ট কেবল একটা শোকজের নোটিশ ঝুলিয়েই সুপ্রিম কোর্টের যেকোন বিচারপতিকে বরখাস্ত করতে পারবেন। 'A judge may be removed from his office by order of the President on the ground of misbehavior or incapacity' । এরপরেও প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক তাঁর ‘মূল কাঠামো’ নামক ধারণার বিচারে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’ অটুট ছিল বলে কি মনে করেন?

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক এর ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ বা ‘মূল কাঠামো’ ধারণার গুষ্ঠি উদ্ধার করে খোদ শেখ মুজিবই (বাকশাল) চতুর্থ সংশোধনী পাশ করেছিলেন। বলা বাহুল্য নির্বাচিত প্রথম জাতীয় সংসদেই তা অনুমোদিত হয়েছিল। এতে ‘জাতীয় সংসদ আইনগতভাবে সংবিধানের মূল কাঠামো ব্যতীত যেকোনো পরিবর্তন আনতে ক্ষমতাবান।’ বিচারপতি খায়রুল হকের এই ধারণাকে শেখ মুজিব বহু আগেই শূন্যে তুলে আছাড় দিয়ে মাটিতে ফেলেছিলেন। মূল কাঠামো রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক চরিত্র, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা -- এর সবগুলোকেই শেখ মুজিবের জাতীয় সংসদই ‘আইনগতভাবে’ পরিবর্তন করে দিয়েছিল। এবং এখনও তা সেভাবেই রাখা আছে।

তাহলে সেদিকে না তাকিয়ে পঞ্চম সংশোধনী আইন ১৯৭৯ এর দিকে আঙ্গুল উঠিয়ে ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ বিষয়ক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক এর মহাবয়ান হাজির করার উদ্দেশ্য কি? পঞ্চম সংশোধনী আইন ১৯৭৯ এর কারণে আমাদের কনস্টিটিউশনের ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ ভেঙ্গে গেছে বলে সারা দেশে যে মিথ্যা প্রপাগান্ডার ঝড় তোলা হয়েছে সেটাই হল মিশন এক্স এর প্রকল্প। নিঃসন্দেহে এটা স্রেফ একটা দলবাজি। শুধু তাই নয় বরং চিন্তা বন্ধক রেখে দলবাজ, বিচারিক নির্বুদ্ধিতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা।

বৈশিষ্ট দুই: ঘরের শত্রু  বাকশালী চতুর্থ সংশোধনী সম্পর্কে বেমালুম নিশ্চুপ; কেবল পঞ্চম সংশোধনীই সব দুঃখের কারণ

আমরা দেখছি তবুও ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশনের ‘বেসিক স্ট্রাকচার বা মূল কাঠামো’-র প্রতি ভক্তপ্রেমিকদের প্রেম-ভক্তি এতটুকু কমে নাই। ‘বেসিক স্ট্রাকচার’র প্রেমিক ভক্তরা ঘরের শত্রু বাকশালী চতুর্থ সংশোধনী সম্পর্কে বেমালুম চুপচাপ। কোন আলোচনা বিচার পর্যালোচনা করতে তারা রাজি না। এই ২০১০ সালে এসেও ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ নিয়ে গলাবাজি করতে এদের গলা কাঁপে না। অথচ ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ নিয়ে গলাবাজি করতে চাইলে সবার আগে মৃত শেখ মুজিবের কৃতকর্ম চতুর্থ সংশোধনী আইনকে কাঠগড়ায় তুলতে হবে। আদালতের অনেক ক্ষমতা, সুয়োমোটো অর্থাৎ স্বউদ্যোগী মামলা আজকাল বেশ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ প্রেমীদের কাউকে কোন মামলা নিয়ে আজ পর্যন্ত আদালতে হাজির হতে দেখা যায় নাই। 

ঘটনা হল, ওপরের আলোচনায় আমরা দেখলাম বেসিক স্ট্রাকচার ধারণাকে তুলে আছাড় দিয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করেছিলেন শেখ মুজিব। প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের সংজ্ঞাই যদি ধরি যে ‘মূল কাঠামো হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক চরিত্র, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ইত্যাদি’, তাহলে বেসিক স্ট্রাকচারের মৃত্যু ঘটেছে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল চতুর্থ সংশোধনী পাশ হবার দিনে। কিন্তু তিনি বা আওয়ামী ড্রয়িং রুমগুলোর ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ প্রেমীরা এটা দেখতে অক্ষম। যদি চিন্তার সততা আঁকড়ে ধরতে পারতেন তবে এঁরা বেসিক স্ট্রাকচারের মৃত্যু স্পট হিসাবে চতুর্থ সংশোধনীকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হতেন। এটা ঠিক যে জিয়ার পঞ্চম সংশোধনীকে কনষ্টিটিউশনের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ মনে করা অসম্ভব। সামরিক আইনকেও কনষ্টিটিউশনের উপরে জায়গা দেয়া অসম্ভব। কিন্তু সেজন্য আমরা মিথ্যাভাষণে বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীতে বেসিক স্ট্রাকচারের মৃত্যু ঘটানোর দায় জিয়া ও পঞ্চম সংশোধনীর উপর চাপাতে পারি না। খাড়াভাবে বললে এটা বিশুদ্ধ দলবাজি এবং আকাশ বাতাস কাপিয়ে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করে বিভ্রান্তি ছড়ানো। আমরা যদি আসলেই বেসিক স্ট্রাকচার প্রেমী হতে চাই তবে শেখ মুজিব বা জিয়ার নামে এসব দলবাজির চোখ সবার আগে ত্যাগ করতে হবে। এরপর বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে যে বেসিক স্ট্রাকচারের ভেঙ্গে পড়েছে সেদিকে সাহসের সাথে নজর করতে হবে। আমরা অনেকে জেনুইন কারণে শেখ মুজিবের প্রতি শ্রদ্ধা রাখি। এর মানে এই না যে এজন্য সৎ চিন্তা করা অথবা চিন্তার সততা ত্যাগ করতে হবে। এদুটোকে আমরা পরস্পর বিরুদ্ধ ভাবনা বানাতে পারিনা। কারণ শেষ বিচারে বাংলাদেশকে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যদি আমরা আমাদের কর্তব্য জ্ঞান করে থাকি।

‘বেসিক স্ট্রাকচার’ আয়ু ফুরিয়ে মৃত হবার ঘটনাটা বাংলাদেশের ভাগ্যে ঘটে গিয়েছিল শেখ মুজিবের খোলনলচে বদলানো  ‘বেসিক স্ট্রাকচারে’ হাত দেবার কারণে। এছাড়াও তা হতে পারে রাষ্ট্র্র নিজ অক্ষমতাগুণে অকেজো হয়ে ভেঙ্গে পড়লে অথবা নতুন কোন বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলে। সেই বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখল গণবিচ্ছিন্ন সামরিক ক্যু হতে পারে, আবার জনগণকে সাথে নিয়ে বিপ্লবও হতে পারে। যাই হোক, সব অর্থেই ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ বদলে ফেলার একটাই মানে যে রাষ্ট্র্র ভেঙ্গে গেছে; একটা উলটপালট ঘটে গেছে। ফলে স্বভাবতই এর কনস্টিটিউশনও শুধু মৃত নয় এর জানাজা-দাফনও ঘটে গেছে। এরপর যেটা দেখার বাকি থাকে তা হল, যে ইন্টারিয়াম বা অন্তর্বর্তীকালীন ধরনের কাজ চালানোর মত ক্ষমতা। মানে এই বদলে দেয়ার মধ্য দিয়ে কোন নতুন গণক্ষমতা সংগঠিত হয়ে সেই ক্ষমতার জোরে রাষ্ট্র্রকে নতুন করে তৈরি করা। জনগোষ্ঠী নিজেকে পুনর্গঠন করে নিতে পারে কি না সেই সম্ভাবনা দেখা। কিন্তু ঘটনা হল, বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী আজও তা পারে নাই।

সে যাই হোক ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ বলতে যদি খোদ রাষ্ট্র্র বা কনস্টিটিউশনের প্রাণবায়ু বোঝানো হয় তাহলে এই অর্থে আইন প্রণয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংসদ কেবল ‘বেসিক স্ট্রাকচার ব্যতীত অন্য সকল বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতাপ্রাপ্ত’ একথার কোন মানে আছে কি? আইন প্রণয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংসদই কী ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনী পাশ করে ‘বেসিক স্ট্রাকচার” এর দফা রফা করে দেয়নি? তাহলে ১৯৭৫ সালে জাতীয় সংসদে গৃহীত চতুর্থ সংশোধনীকে কী আদালতের সবার আগে অবৈধ ও বাতিল বলে ঘোষণা করা উচিত না?  কিন্তু আমার মাথার ভেতরে আছে শেখ মুজিব ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ ভেঙ্গে দিলে জায়েয কিন্তু জিয়া অবৈধ ক্ষমতার ভিত্তিতে তা জোড়া দেবার চেষ্টা করলে তা নাজায়েয। অথবা কেবল জিয়ার পঞ্চম সংশোধনীকে নাজায়েজ বলার সুবিধা নেবার জন্য মিথ্য দলবাজি চিন্তায় ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ বলে গলা ফাটানো। এটা কখনও সৎ চিন্তা হতে পারে না। এতে সমস্যাটা শুধু সিন্সিয়ারিটি অর্থে সৎ অসৎ এর ব্যাপার হয়েই শেষ হয় না। আগেই আয়ু ফুরানো মৃত এই রাষ্ট্র্র বা কনস্টিটিউশন এই দলবাজিতে জিন্দা হয়ে যায় না এবং যাবেও না। সীমাহীন দলবাজিতে বরং রাষ্ট্র্র বা কনস্টিটিউশন অকেজো হয়ে পড়ে থাকে। গণপ্রজাতন্ত্রী হবার সকল সম্ভাবনা শুন্যে মিলিয়ে যায় আমরা তাই হতে দেখছি।

‘বেসিক স্ট্রাকচার’ প্রেমীরা এই দলবাজিতে সর্টকার্ট মারতে ঘরের দিকে মুখ লুকিয়ে বাইরের শত্রু, ষড়যন্ত্র তালাশ করে বেড়ায়। এই ‘বেসিক স্ট্রকাচারের’ ইনসিন্সিয়ার বয়ান এদেরকে এমনই অন্ধ করে রেখেছে যে, জিয়া এবং পঞ্চম সংশোধনী হল তাদের সব দুঃখের কারণ এই ধারণা তাঁরা মনে প্রাণে গেঁথে নিয়েছে।

পঞ্চম সংশোধনীকে অবশ্যই আমাদের পর্যালোচনা-বিচারের অন্তর্গত করতে হবে। কিন্তু সেজন্য সযত্নে আইনি বিচারের দিক থেকে চতুর্থ সংশোধনী আইন অথবা রাজনৈতিক পর্যালোচনার দিক থেকে বাকশালকে ইচ্ছা করে বাদ রাখতে হবে? এটা হতে পারে না। সোজা বাংলায় বললে এটা নিজের চিন্তার সাথে শঠতা। কেউ সক্ষম, শক্তিশালী চিন্তার সাহস অর্জন করতে চাইলে এর প্রথম শর্ত হল চিন্তাকে স্বাধীন রাখতে হবে। ওমুক জিনিসটাকে চিন্তার পর্যালোচনার বিষয় করা যাবে না। মন সেদিকে যেতে চাইলেও ওকে শিকল পরাতে হবে। এমন কোন জুয়াচুরি চলবে না। ১৯৭২ এর কনস্টিটিউশন, শেখ মুজিবের শাসন ইত্যাদিকে কারও ‘স্বর্ণযুগ’ মনে হতেই পারে।  কিন্তু পরক্ষণেই ওই ‘স্বর্ণযুগ’ ভাবনাকেও খুঁটিয়ে পুনর্বিচার পর্যালোচনার আওতায় আনতে পারতে হবে। জানা সত্যকেও বারবার পুনর্বিচার পর্যালোচনার আওতায় আনতে হবে, সজীব করে নিতে হবে। চিন্তা যা চিন্তা করতে চায় ওকে করতে দিতে হবে, কোন লাগাম পরানো চলবে না, তবেই একমাত্র চিন্তার স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্ভব। সাহসী চিন্তা হওয়া সম্ভব।

সম্ভব না হয় বুঝা গেল, কিন্তু কেন সাহসী চিন্তার দরকার? কারণ এটা বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য দরকার, আমাদের জনগোষ্ঠীগত স্বার্থের জন্য দরকার। এটা সংকীর্ণ আওয়ামী লীগ বা বিএনপির ব্যাপার একেবারেই না। কি করলে এটা আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপির সুবিধা হবে এটা কেবল তাদের দলবাজির লড়াই হয়ে থাকতে পারে না। ঘটনা হল, আমাদের রাষ্ট্র্র, কনস্টিটিউশন ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নাই। ফলে নতুন আমরা কি করতে পারি, সে ভাবনা চিন্তার ঝড় তুলে জনগোষ্ঠীগত স্বার্থে আমরা যদি আবার সংগঠিত হতে পারি, নিজেদের রাষ্ট্র নতুন করে গঠন বা কনস্টিটিউট করতে পারি সেই দিকেই আমাদের মনোযোগ ধাবিত হওয়া দরকার। যেন একটা জনগোষ্ঠীর সব অংশের প্রতিনিধিত্বমূলক কনস্টিটিউশন পেতে পারি সে লক্ষ্যেই কাজ করাটাই আমাদের একমাত্র প্রকল্প হয়ে ওঠা উচিত। মিশন এক্স যদি ইতিবাচক ভূমিকা নিতে চায় তবে এটাই হতে হবে তার প্রকল্প। এই বিচারের প্রেক্ষিতে পুরনো বেসিক স্ট্রাকচার ভেঙ্গেছে চতুর্থ সংশোধনী আইন, না পঞ্চম সংশোধনী আইন -- এটাও অপ্রয়োজনীয় তর্ক। কারণ বাস্তবতা হল এটা ভেঙ্গে গেছে। সামনের দিকে তাকিয়ে কিছু করতে পারি কি না, আবার গড়তে পারি কি না এটাই মুখ্য প্রশ্ন। কি কারণে ভেঙ্গেছে সেটা যারা আগামী দিনের ইতিহাসবিদ তাঁদের গবেষণার কাজ হয়েই থাকুক। একটাকে আড়াল করতে অপরটাকে দোষারোপ করা দলবাজি হিশাবে হাজির হতে বাধ্য। আমাদেরকে চোখ খোলা রেখে চিন্তা স্বাধীন রেখে সামনের দিকে তাকাতে পারতে হবে, তবেই কোন ইতিবাচক প্রকল্প সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবে তৈরি হতে পারে। এজন্যই চিন্তায় সাহসী ও র‌্যাডিক্যাল হওয়া দরকার। দলবাজিতে আমাদের কোন ভবিষ্যত নাই, দেখাই যাচ্ছে।

‘বেসিক স্ট্রাকচার’-এর বয়ানধারীদের কেউই এখনও চিন্তায় সে সাহসের অধিকারী নয়। এজন্য চতুর্থ সংশোধনীতে ‘বেসিক স্ট্রাকচার’-কে পঞ্চম সংশোধনীর আগেই তুলে আছাড় মারা হয়েছে সেদিকে বিচার করবার বা পর্যালোচনার চোখ ফেলতে এরা রাজি না। ‘বেসিক স্ট্রাকচারের’ ধারণাটাকে যখন পঞ্চম সংশোধনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়, কাজে লাগে এরা তখনই কেবলমাত্র ‘বেসিক স্ট্রাকচারবাদী’। এতেই এই ‘বেসিক স্ট্রাকচারবাদীরা’ যে আসলেই বৈচারিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে অসৎ সেটা ধরা পড়ে।

তবুও নিজেদের পর্যালোচনার জন্য প্রশ্নটা তোলা দরকার যে, শেখ মুজিব তো ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্র্র ও কনস্টিটিউশন আছাড় মেরে ভেঙ্গে তছনছ করে দিয়ে চলে গেলেন, যেন নিজে মরে বাঁচলেন, কিন্তু এরপর জীবিত আমাদের কি হল? ‘বেসিক স্ট্রাকচার’-এর আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়ে আদালত যে আবার কেবল পঞ্চম সংশোধনী নিয়ে ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ প্রসঙ্গে আমাদের বিরাট জ্ঞানের কথা শুনাতে বসল সেই জুডিশিয়াল রিভিউ’র ক্ষমতা ও রিট শুনার ও প্রতিকার আদেশ জারির ক্ষমতা কিভাবে কি করে ফিরে পেল? ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারির পর কবে থেকে কিভাবে সুপ্রিমকোর্ট রিট আবেদন শুনা শুরু করল? কি করে আদালত ক্ষমতা ফিরে পেল? এর হদিস করতে আমাদেরকে এখন এক নরকের পাঁক আবর্জনা ঘাঁটতে হবে। খুনী মোস্তাকের সামরিক ফরমান, খোদ প্রধান বিচারপতি সায়েমের নিজেকে স্বঘোষিত রাষ্ট্র্রপতি দাবি করা ক্ষমতার সামরিক আইন আর সেই ধারায় জিয়াউর রহমানের সামরিক আইনের ক্ষমতাবলে মৃত কনস্টিটিউশনের ‘বেসিক স্ট্রাকচার’-এর আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরে এসেছে। আসলেই কি এসেছে না আর আসতে পারে? তা আমরা একটু পরে দেখব। যা বলছিলাম, এককথায় তারা শেখ মুজিবের অমোচনীয় চতুর্থ সংশোধনীর পাপ ধুয়ে মুছার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তারা প্রত্যেকে ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ হওয়ারই কথা। সেই সাথে তাদের নিজেদের পাপ ধোয়ার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। এরই সাক্ষাত সারাংশ হল পঞ্চম সংশোধনী ১৯৭৯; এই সংশোধনী পাশের পরই জিয়াউর রহমান দাবি করেছিলেন এখন থেকে কনস্টিটিউশন আবার জিন্দা। ফলে আদালত সেটা মেনে নিয়ে তার জুডিশিয়াল রিভিউ’র কনস্টিটিউশনাল ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে ধরে নিয়ে এখন ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ প্রসঙ্গে বিরাট জ্ঞানের কথা আমাদের শুনতে হচ্ছে। এটাই হল, তামাশা।

হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগ এখন যে কোন রিট আমলে নেবার ক্ষমতা পেয়েছে বলে মনে করে পঞ্চম সংশোধনী আইন নিয়েও সে বিচারে বসেছে। আদালতের এই ক্ষমতার ভিত্তি, এখতিয়ার কি? ভিত্তি হল কনস্টিটিউশনের পঞ্চম সংশোধনী। আমার কথা শুনে কেউ আঁতকে উঠতে পারেন কিন্তু ঘটনাটা তাই। আমি নিজের বরাতে একথা বলছি না। বলছি, আপিল বিভাগের রায়ের বরাতে।

পাঠককে সাথে নিয়ে এখন আমরা আপিল বিভাগের রায় দেখব। এর আগে আমরা জেনেছিলাম চতুর্থ সংশোধনীতে ১০২ অনুচ্ছেদের কারণে আদালতের রিট শুনার ও আমলে নেবার ক্ষমতা ‘নাই’ হয়ে গিয়েছিল, অন্যদিকে কনস্টিটিউশনের ৪৪ অনুচ্ছেদ সংশোধিত না, একেবারে পুরা বাতিল (omitted) করার কারণে সংক্ষুব্ধ নাগরিকের মৌলিক অধিকার বলে আদালতের কাছে প্রতিকার চেয়ে রিট করারও ক্ষমতা নাই হয়ে গিয়েছিল। এই ছিল সর্বশেষ অবস্থা। এরপর পঞ্চম সংশোধনী আইন ১৯৭৯ আদালতকে ১০২ অনুচ্ছেদ আর নাগরিককে ৪৪ অনুচ্ছেদ ফিরিয়ে দিচ্ছে বলে দাবি করেছিল। সেই ক্ষমতায় ক্ষমতাধারী হয়ে মুন সিনেমা হল মামলার রায়ে (জনপ্রিয় অর্থে পঞ্চম সংশোধনী মামলা) আপিল বিভাগের ১৮৪ পৃষ্ঠার মূল রায়ের সারাংশ করা হয়েছে ১৮৩ পৃষ্ঠায়, সেখানেও যাব।

3. (iii), 3. (iv) এবং 3. (v) এ বলা হচ্ছে:

3. In respect of condonation made by the High Court Division, the following modification is made and condonations are made as under:

(iii)  the  Second Proclamation (Seventh Amendment) Order,

1976(Second Proclamation Order No. IV of 1976) and the Second Proclamation (Tenth Amendment) Order, 1977(Second Proclamation Order No. 1 of 1977) so far it relates to amendment of English text of Article 44 of the Constitution;

(iv) the Second Proclamation (Fifteenth Amendment) Order, 1978 (Second Proclamation Order No.IV of 1978) so far it relates to substituting Bengali text  of Article 44;

(v) The Second Proclamation (Tenth Amendment) Order, 1977(Second Proclamation Order No. 1 of 1977) so far it relates to inserting Clauses (2), (3), (4), (5), (6) and (7) of Article 96 i.e.

provisions relating to Supreme Judicial Council and also clause (1) of Article 102 of the Constitution, and ...

সোজা বাংলায় এর অর্থটা এরকম: ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে ক্ষমতা নেয়া প্রেসিডেন্ট সায়েম ও ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ সালের ক্ষমতা নেয়া প্রেসিডেন্ট জিয়া তাদের ১৯৭৬-৭৮ এই সময়কালে সামরিক অধ্যাদেশ -- এই ক্ষমতার বরাতে ৪৪ অনুচ্ছেদ ও ১০২ অনুচ্ছেদ ফিরে এসেছে বলে ঘোষণা করেছিলেন। আর মুন সিনেমা হল (জনপ্রিয় অর্থে পঞ্চম সংশোধনী) মামলার রায়ে আপিল বিভাগ সায়েম ও জিয়ার এগুলো করা ঠিক হয়েছে (condoned) বলে ঘোষণা করছে। এর মানে হল সুপ্রিম কোর্ট পঞ্চম সংশোধনী আইনই যে তার ক্ষমতা এবং জুডিশিয়াল রিভিউ’-র  এখতিয়ার ফিরে পাবার কারণ সেটা স্বীকার করছে।

এখন আরও একটু ভেতরে যাই। পঞ্চম সংশোধনী যদি সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতার ভিত্তি হয় তাহলে এখন মোস্তাক, সায়েম ও জিয়া --যাদের সাফাই এই পঞ্চম সংশোধনী--তাদের ক্ষমতার ভিত্তি কি? মোস্তাক, সায়েম ও জিয়া সবাই দাবি করেছেন তাদের মুখের কথা অর্থাৎ সামরিক আইন ফরমান। বাংলাদেশের কনস্টিটিউশনের উর্ধ্বে এও ফরমানের অবস্থান। কিন্তু কনস্টিটিউশনের ৭ অনুচ্ছেদ বলছে কনস্টিটিউশন সব কিছুর ওপরে সুপ্রীম বা সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, একমাত্র এর অধীনেই আইনের শাসন ঘটতে পারে। অতএব মোস্তাক, সায়েম ও জিয়ার  ক্ষমতার ভিত্তি কনস্টিটিউশন-বহির্ভূত। এই বিষয়টা নিয়ে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে শুনানির সময় মেলা তর্কবিতর্কে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

অতএব এই যুক্তিতে সুপ্রিম কোর্টের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বৈচারিক ক্ষমতা ফিরে পাওয়া ও জুডিশিয়াল রিভিউ’র এখতিয়ার পুনরায় অর্জনও কনস্টিটিউশন বহির্ভূত ও ভিত্তিহীন। মূল কারণ হল, যে তাকে বৈচারিক ক্ষমতা ফিরিয়ে দিচ্ছে এবং জুদিশিয়াল রিভিউর এখতিয়ার পুর্নবহাল করছে তার নিজের ক্ষমতাই অবৈধ। তাহলে সারকথায় সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা ফিরে পাবার ভিত্তি হল এক সামরিক আইন।

আসলে অবৈধ এক চক্রের আবর্তে পড়ে গেছি আমরা সবাই। মশকরাটা হল, সুপ্রিম কোর্টের নিজের ক্ষমতার উৎস ঠিক নাই, বৈধতা ঠিক নাই অথচ সে অন্যের বৈধতা নিয়ে বিচারে বসেছে, রায় দিচ্ছে। অথচ যেখান থেকে সুপ্রিম কোর্ট নিজের ক্ষমতা হারিয়েছিল সেই চতুর্থ সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিমকোর্টের বলবার মুরোদ হয় নাই, আজ পর্যন্ত বলতে পারে নাই যে ওই চতুর্থ সংশোধনী অবৈধ; এবং কনস্টিটিউশন লঙ্ঘনের জন্য শেখ মুজিবকে শাস্তি দেয়া হল, ইত্যাদি। বরং আজও চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে প্রশ্ন না তুলে সুপ্রিম কোর্টের নিজের ক্ষমতা ও এখতিয়ারের ভিত্তি খুঁজছে condonation এর মধ্যে; মানে, মুখ লুকাচ্ছে মোস্তাক, সায়েম জিয়ার সামরিক আইনের শাসনের সারাৎসার পঞ্চম সংশোধনী আইনের মধ্যে; বেছে বেছে যেসব কাজকে ঠিক আছে বলে রায় দিচ্ছে সেখানে। আর উল্টা দিকে কপট ভাব ধরে বলছে সামরিক আইনকে কিন্তু আমরা অনুমোদন দেই নাই। 'While dismissing the leave petitions we are putting on record our total disapproval of Martial Law…….' একদিকে নিজে স্বীকার করছে সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার ও ক্ষমতার ফিরে পাবার নতুন ভিত্তি হচ্ছে এক সামরিক আইন। অন্যদিকে আবার সামরিক আইনকেই সে অবৈধ বলছে। সত্যিই বড় বিচিত্র এই বিচার!

সুপ্রিম কোর্ট এর জুডিশিয়াল রিভিউ’র এখতিয়ার, ক্ষমতার ভিত্তি যে সামরিক আইন এটা তার অজানা নাই। একে ঢেকে রাখতে আপিল বিভাগ ওই একই রায়ের শেষে একটা জোড়াতালি দিয়ে বলছে: (f) all acts and legislative measures which are in accordance with, or could have been made under the original Constitution. অর্থাৎ মূল কনস্টিটিউশনের অধীনে এরকম আইন একটা হতেই পারত তাই condonation-এর মধ্যেই মুখ লুকিয়ে রাখতে হবে। এতে এই কথাটাই স্বীকার করছে যে, মূল কনস্টিটিউশন অনুযায়ী এই আইন হয় নাই। এখানে সুপ্রিম কোর্ট একটা ভাব ধরেছে যেন মোস্তাক, সায়েম ও জিয়ার  ক্ষমতা বা সেই অর্থে ওদের সামরিক আইন ঘটিত পঞ্চম সংশোধনী কি কি অংশ সে (condonation) মাফ করে- ঠিক আছে বলে রায় দিল। অথচ আসলে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই নিজের ক্ষমতার ভিত্তি, এখতিয়ারের অবৈধতাকে এখন বৈধ বলে ঘোষণা করে নিল।

অথচ ব্যাপারটা হল, মোস্তাক, সায়েম ও জিয়ার  ক্ষমতা বা সেই অর্থে তাদের সামরিক আইন ঘটিত পঞ্চম সংশোধনী সুপ্রিমকোর্টের জুডিশিয়াল ক্ষমতা ফেরৎ দিল কি দিল না তাতে কিছুই আসে যায় না। কারণ এরা নিজেই অবৈধ। এদের কাছে সুপ্রিমকোর্টের জুডিশিয়াল ক্ষমতার বৈধতা ভিক্ষা করলে সে আর সুপ্রিমকোর্ট থাকে না।

মূল বিষয় হল, সুপ্রিমকোর্টের জুডিশিয়াল ক্ষমতা সবসময় ছিল আছে, যতদিন কনস্টিটিউশন আছে ততদিন। কারণ ওটা কনস্টিটিউশনের জন্মের সময় দেয়া ক্ষমতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, এই ক্ষমতা কেউ রদ করে দিতে পারে এমন আইনি কনস্টিটিউশনাল ক্ষমতা কনস্টিটিউশন কাউকে দেয় নাই। ফলে শেখ মুজিব চতুর্থ সংশোধনী আইন দিয়ে সে ক্ষমতা রদ করার যে দাবি করেছেন সেটাই অবৈধ। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট নিজেই এখনও চতুর্থ সংশোধনী আইনকে অবৈধ বলার কাজটা করে নাই, করতে পারে নাই। এটাই হোল এই প্রহসনের মূল দিক।

বাস্তবে যতদিন খোদ চতুর্থ সংশোধনীকে সুপ্রিম কোর্ট চ্যালেঞ্জ না করে বরং condoned বলে মেনে নেবে ততদিন তার জুডিশিয়াল ক্ষমতার ভিত্তি, এখতিয়ার সবসময় অবৈধই থেকে যাবে।

কিন্তু মিশন এক্সের দলবাজি প্রকল্পের কারণে, সেকাজে না গিয়ে সে পঞ্চম সংশোধনীর ওপর কামান দাগাচ্ছে। অথচ পঞ্চম সংশোধনী তার জুডিশিয়াল ক্ষমতার ভিত্তি বা এখতিয়ার হারানোর কারণ না। বেচারা ভাল মানুষ সেজে ক্ষমতা ফেরত দিতে এসেছিল। কিন্তু তার আদি পাপ হল তার নিজেরই বৈধতার ঠিক নাই। 

জিয়ার ক্ষমতার আদি পাপ হল, ক্ষমতা সে বটে সন্দেহ নাই কিন্তু বাংলাদেশের উপস্থিত কনস্টিটিউশনের চোখে ওটা সবসময় সব অর্থেই অবৈধ। কোন ক্ষমতা দখলই পুরনো কনস্টিটিউশনকে নিজ ক্ষমতার অধীনস্থ বলে ফরমান জারি করে চলতে পারে না। শব্দের সমস্যাটাই খেয়াল করুন। ‘ফরমান’ বলতে হচ্ছে কেন? কারণ এমন এক শব্দ ব্যবহার করতে হবে যেটা পুরনো কনস্টিটিউশনে নাই। আমাদের কনস্টিটিউশন অনুযায়ী জাতীয় সংসদেই একমাত্র আইন প্রণীত ও গৃহীত হতে পারে; পরে  রাষ্ট্র্রপতি সেটাকে রাষ্ট্রের আইন হিশাবে ঘোষণা দেন। আইন জারি ও বলবৎ হয়ে যায়। অথবা সংসদ অবকাশে থাকলে প্রেসিডেন্টের ‘অধ্যাদেশ’ বলে আইন যদিও হয় তবে তাও আবার পরে সংসদ বসলে সেখানে অনুমোদনে পাশ হওয়া শর্ত আছে। এখন ‘সংসদের আইন’ বা রাষ্ট্র্রপতির ‘অধ্যাদেশ’ বলে আইন এ দুই শব্দের কোনটাই মোস্তাক, সায়েম বা জিয়ার ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। ফলে এখন এমন নতুন শব্দ আমদানি করতে হচ্ছে যা কনস্টিটিউশনে নাই।

তবে জিয়ার আদি পাপের একটাই সমাধান হতে পারত। যখন পুরনো রাষ্ট্র্র, ও কনস্টিটিউশন ক্ষমতাবলে বাতিল করে দিয়েছে তখন নজেকে এক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলে ঘোষণা করতে পারতেন জিয়াউর রহমান। কিন্তু তাঁর সামরিক বুদ্ধি অতদূর যায়নি। এর সবচেয়ে বড় কঠিন অংশটা হল নিজেকে জনগণের ক্ষমতা হিশাবে প্রমাণ করা ও নতুন কনস্টিটিউশন প্রণয়ন শেষে নতুন রাষ্ট্রের পত্তন ঘটানো। সে মুরোদ জিয়াউর রহমানের ছিল কিনা সেটা এখন বড়জোর একটা কূটতর্কের বিষয় হতে পারে।

কুফল এই যে আমাদের প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের কাছ থেকে ‘বেসিক স্ট্রাকচার’-এর গল্প এখনও শুনে যেতে হচ্ছে। মিশন এক্সের ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ ধারণা, চিন্তার দৌড়ের এমনি মহিমা। ওদিকে মিশন এক্স যদি মূল জায়গা চতুর্থ সংশোধনী আইনকে চ্যালেঞ্জ করে কোর্টে যাবার হিম্মত দেখাতে পারত তবে ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ এর গল্পের একটা মানে থাকত। কিন্তু মিশন এক্সের পক্ষে এটা করা অসম্ভব। কারণ, নিজের চোখ আর চিন্তাকে দলবাজির কাছে বন্ধক রেখে ওর জন্ম হয়েছে। চতুর্থ সংশোধনী আইনকে চ্যালেঞ্জ করার রাজনৈতিক মূল্য আওয়ামী লীগকে এমন আঘাত করবে যাতে তার আবার উঠে দাঁড়ানো মুশকিল। মিশন এক্স আওয়ামী লীগকে বাঁচানোর কর্তব্য নিয়ে জন্ম হয়েছে। কোনদিন যদি মিশন এক্স এর হুঁশ ফিরে যে, আওয়ামী লীগ বাঁচল কি না এটা তার বিচার করার কর্তব্য নয়, বরং বাংলাদেশকে একটা গণপ্রজাতান্ত্রিক কাঠামো ও আইনের শাসন উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে সে ভূমিকা নিতে চায় তবেই একমাত্র মিশন এক্স নিজেকে বাঁচাতে পারবে। এটাকেই চিন্তার সাহস বলতে পারি আমরা। অন্যথায় মিশন এক্স একটা দলবাজির নাম।

বৈশিষ্ট তিন: বেসামরিক বনাম সামরিক আইন

মিশন এক্স এর মত আওয়ামী ড্রয়িংরুমের চিন্তাগুলার মধ্যে দৃঢ় মনে গেঁথে নেয়া একটা ধারণা হল, যত দোষেরই হোক শেখ মুজিবের শাসন ছিল সিভিল, ফলে ওটা জায়েজ। সামরিক আইন এটা একেবারেই না জায়েজ শুধু না, সব নষ্টের গোড়া। বাংলাদেশের দুঃখের কারণ। স্বর্ণযুগ ৭২ সালের কনস্টিটিউশন আর টিকে থাকে নাই ক্যান্টনমেন্টের কারণে। শেখ মুজিবের বাকশাল চতুর্থ সংশোধনী খারাপ কিছু ছিল হয়ত কিন্তু সেটা ছিল সংসদের আইন, সিভিল ব্যাপার স্যাপার, ফলে তা তুলনায় সামরিক শাসনের চেয়ে সরেস। ইত্যাদি। এই প্রপাগান্ডা এতই প্রবল যে আমাদের অনেকের মনে তা একটা জায়গা করতে পেরেছে।

এই বিষয়টা নিয়ে নতুন করে কথা লম্বা করব না। কারণ ওপরের আলোচনায় এতক্ষণ আমরা দেখেছি বেসামরিক চতুর্থ সংশোধনী আইন কিভাবে খোদ কনস্টিটিউশনকেই নাই করে দিয়েছিল। প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের প্রিয় ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ আছাড় খেয়ে চুরমার হয়ে আছে। শেখ মুজিব সামরিক শাসক না কিন্তু সেকারণে আমাদের কনস্টিটিউশন, রাষ্ট্র্র আছাড় খেয়ে ভেঙ্গে চুরমার হওয়া থেকে বাঁচতে পারে নাই। এখনও বেসামরিক শেখ মুজিব ও তাঁর সংসদের কারণেই সুপ্রিমকোর্ট সহ আমরা সবাই এক অবৈধতার চক্রে আটকে আছি। ফলে আমাদের রাষ্ট্র্র, কনস্টিটিউশন ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ ধ্বংস করে ফেলার জন্য সামরিক না বেসামরিক শাসনের অধীনে ঘটেছে। তাতে কোন ফারাক পড়ে নাই, ধ্বংস যা হবার তা হয়েছে। তবু একটা তফাত টেনে বড় জোর এভাবে বলা যায়, শেখ মুজিব নিজে বাংলাদেশে  কনস্টিটিউশন এবং কনস্টিটিউশনাল শাসনের সমাপ্তি টেনে দিয়েছিলেন আর জিয়া সে আবর্জনা নিজের স্বার্থে সাফ করতে চাইলেও নিজের ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে না পেরে সে পাঁকচক্র আরও কতক বাড়িয়ে দিয়েছে।

সারকথা হল, কনস্টিটিউশন এবং কনস্টিটিউশনাল শাসনের বা আমাদের খোদ রাষ্ট্র্রটাই কোন সামরিক ক্ষমতার কবলে পড়ে মারা গিয়েছে বেসামরিকদের হাতে মরে নাই --এই ভাবনা একেবারেই ভিত্তিহীন। একমাত্র এখনকার দলবাজির প্রচারণাতেই এমন দাবি টিকে আছে।

এই দলবাজি চিন্তার এতই প্রাবল্য যে খোদ সুপ্রিম কোর্ট পঞ্চম সংশোধনী মামলাটাকে ভেবেছে এটা সামরিক আর বেসামরিক শাসনের মামলা। এবং তা ধরে নিয়েই বিচারে বসেছে। পাতার পর পাতা জুড়ে তাই পাকিস্তানের সামরিক শাসনের রেফারেন্স টেনেছে। অথচ সুপ্রিম কোর্টের খেয়ালই নাই যে, নিজের কনস্টিটিউশনাল ক্ষমতা জুডিশিয়াল ক্ষমতার ভিত্তি ও এখতিয়ার সে ফিরে পেয়েছে সামরিক ফরমানের মাধ্যমে। যেটার জোরে সে করে খাচ্ছে তা হারিয়েছে বেসামরিক শেখ মুজিব ও তাঁর বেসামরিক সংসদের হাতে।

আওয়ামী ড্রয়িংরুম কেন্দ্রিক ‘মিশন এক্স’ ধরনের চিন্তার বৈশিষ্ট্যসূচক দিকগুলো নিয়ে আলোচনার এখানেই ইতি টানছি। এখন পরিণতিতে ইতিমধ্যে এর প্রকল্প কোথায় গিয়ে ঠেকেছে সেবিষয়ে কিছু কথা বলে শেষ করব।

মিশন এক্স এর পরিণতি ও আশ্রয়স্থল কোথায়?

আগে মিশন এক্স এর তৎপরতা ও কাজের পছন্দসই ধরন সম্পর্কে বলেছিলাম, তারা আদালতের করিডোরে বিচারিক প্রভাব বিস্তার করে রাজনীতির করণীয় কাজ করতে পছন্দ করে।  এর মানে মিশন এক্স এর প্রকল্প অনুযায়ী নিজেদের চিন্তার ক্ষমতা দেখিয়ে যে রাজনৈতিক লড়াই সেটা রাজনৈতিকভাবে সামাজিক সচেতনতার ঝড় তোলা লড়াই নয়। এটা বরং উল্টা আদালতে প্রভাব খাটিয়ে যতদূর সম্ভব রাজনৈতিক সচেতনতার আন্দোলন এড়িয়ে চলা। প্রতিপক্ষের চিন্তার সাথে সে লড়ে নিজের দলবাজি চিন্তার পক্ষে কোনমতে আদালতের একটা রায় জোগাড় করে। এটা বেশি করে ধরা পড়েছে মুন সিনেমা হল (জনপ্রিয় অর্থে পঞ্চম সংশোধনী) মামলায় হাইকোর্টের রায়ের পর মামলাটা নিয়ে আপিল কোর্টের ভূমিকায়। সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি অনুমোদন করে নাই। বরং আপিলের অনুমতি দেয়া হবে কি না এ নিয়ে এক সংক্ষিপ্ত শুনানি শেষে সব খামোশ করে দেয়া হয়। জানিয়ে দেয়া হয় আপিলের অনুমতি নাকচ, তবে আপিল আদালত (আপিল বিভাগ) কিছু পর্যবেক্ষণ জানাবেন। আপিল আদালতের পর্যবেক্ষণ রায় (এটাকে পর্যবেক্ষণ রায় লিখতে অস্বস্তি হচ্ছে) হাইকোর্টের রায়ের ভেতর থেকে পিক এন্ড চুজ এর এক বাছাই পর্ব মাত্র, স্বভাবতই এক অসামঞ্জস্যপূর্ণ জগাখিচুড়ি, যা আমরা এর আগের আলোচনায় দেখেছি। পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ে সুপ্রিমকোর্ট তার জুডিশিয়াল ক্ষমতার ভিত্তি, ও এখতিয়ার ফিরে পেতে শেষাবধি সামরিক আইনকেই বেছে নিয়েছে। এতে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, আপিল আদালত যদি পিক এন্ড চুজ এর এক বাছাই পর্বই করলেন তবে তারই বা ভিত্তি কি? আপিল করার অনুমতি তো আপিল কোর্ট নাকচ করছে। তাতে হাইকোর্টের রায়কে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ বাদী-বিবাদীর বক্তব্যের আলোকে পুনর্বিচার করে দেখার অনুমতি তো আপিল বিভাগ কাউকেই দেয় নাই। ফলে আদালতের নিজেরও তা না পাওয়ারই কথা। অর্থাৎ বাদী-বিবাদী কাউকেই হাইকোর্টের রায় পুনর্বিচারের লক্ষ্যে কথা বলতে দেয়া হয় নাই, সেখানে যুক্তিতর্ক চলেছে আমাদের রাষ্ট্র্র ও কনস্টিটিউশন সংক্রান্ত ওই গুরুত্বপূর্ণ মামলার পুনর্বিচারের মেরিট আছে কি না তা নিয়ে। মামলার পুনর্বিচারে যদি আদালত যেত তবে বাদী-বিবাদী উভয়ে নতুন করে যেসব যুক্তিতর্ক সাজাতো সেই পুর্ণাঙ্গ বক্তব্য আপিল-আদালতের কাছে নাই। তাহলে আপিল-আদালতের নিজের পর্যবেক্ষণের ভিত্তি কোথায়? আপিল আদালত যদি সিদ্ধান্তে আসে হাইকোর্টের রায়ই সহি, একে আর পুনর্বিচার করে দেখার মত মনগলানো যুক্তিতর্ক বাদী বিবাদী কেউ দিতে পারে নাই তাহলে তো মামলা ডিসমিস। এরপর আবার পর্যবেক্ষণের নামে হাইকোর্টের রায় পুনর্বিচারের কোন সুযোগ আপিল কোর্টেরও নাই। আর যদি পুনর্বিচারের মত গুরুত্বপূর্ণ মেরিট থেকেই থাকে তাহলে আপিলের অনুমতি দিয়ে বাদী-বিবাদী উভয়ে নতুন করে যেসব যুক্তিতর্ক সাজাত তখন সেই পূর্ণাঙ্গ আলোচনা দিয়েই পর্যবেক্ষন সম্পন্ন হত। তা থেকেই আপিল-আদালত বিচার করার মালমসলা ও ভিত্তি যোগাড় করতে পারত।

ওই আপিল আদালত তো আগে বলে নেয় নাই যে, আমি কিন্তু এক পর্যবেক্ষণ দিয়ে মামলা শেষ করব ফলে বাদীবিবাদী উভয়েই আমার পর্যবেক্ষণমূলক রায় কি হতে পারে সেটা মাথায় রেখে যুক্তিতর্ক সাজিয়ে কথা বলবেন। আপিলের মেরিট আছে কি না সেটা ছিল বিচার্য বিষয়।

বিচার মানে বিচারকের মনগড়া বিবেচ্য বিষয় ঠিক করে বিচার নয়, বাদীবিবাদীর যুক্তিতর্ক পয়েন্ট এগুলোই যে মুখ্য ভিত্তি তৈরি করে সে আলোকেই ঘটনার বিচার।

এই মামলায় হাইকোর্টের রায় হয় ২০০৫ সালে। আর রায় লিখে শেষ করে প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালে। এরপর আপিল বিভাগের প্রধান বিচারকের অবসরের ঠিক আগে আগে কোনমতে মাস খানেকের মধ্যে ছয়টা শুনানির মধ্যেই মামলা আপিল বিভাগ পার করে নেয়া হয়। অজুহাত হল, বিশেষ ওই সময়ের প্রধান বিচারক অবসর নেবেন। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় দিতে চার বছর ফেলে রাখার পরে আপিল বিভাগে এসে এই তাড়াহুড়ো নিয়ে সন্দেহ করতে হবে কেন, এটার বুঝ খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

বাংলাদেশের কনস্টিটিউশন শুরু থেকেই জগাখিচুড়ি তালি মেরে চলেছে, চতুর্থ সংশোধনী যোগ করে সেটাকে কনস্টিটিউশন নামের অযোগ্য করে তোলা হয়েছে; এর ওপর আবার সামরিক আইনের হাতে পড়ে সেটাকে আবার জিন্দা বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যে নিজেই সামরিক আইন সে কি করে কোন কনস্টিটিউশনকে জিন্দা করবে? বাংলাদেশের এই পরিস্থিতিতে সমাজে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার তাগিদের দিক থেকে যদি দেখি তবে বাংলাদেশে একটা প্রতিনিধিত্বমূলক ও ইনসাফ নিশ্চিত করে এমন কনস্টিটিউশনের পক্ষে রাজনৈতিক আন্দোলন লড়াই এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই কাজটা বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের বিজয় বা সুবিধা পাইয়ে দেওয়া নয়; এমন ভাবনা সংকীর্ণ বললেও কম বলা হবে, খুদে দোকানদারের ভাবনায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড আলোচনার নীতিনির্ধারণ করার ভার দেবার মত হবে। খাস বাংলায় এটাকে আমরা দলবাজি বলি। মিশন এক্স এর চিন্তা আগাগোড়াই এই দলবাজির প্রভাব ভরপুর। জনগণ জাহান্নামে যাক, কনস্টিটিউশনে কি থাকছে না থাকছে তা নিয়ে তাদের সম্পর্কে লিপ্ত হবার যেন কিছু নাই, ওরা বেখবর আছে যেমন তেমনই থাকুক। শেখ মুজিবের চতুর্থ সংশোধনী আইন ১৯৭৫ এর সময় আমরা দেখেছি, জনগণ জেনেছে, শেখ মুজিব নাকি বাকশাল বলে একটা খারাপ কিছু করেছে। কিন্তু সেটা কি তা জনগণকে কেউ জানায় নাই। অথচ জনগণ যে খোদ তাদের রাষ্ট্র্রের কনস্টিটিউশনটাই হারিয়ে বসে আছে কেউই সেটা বলে নাই। সুপ্রিমকোর্ট তার আসল ক্ষমতা খুইয়েছে; এরপরের বিচারকরা টু শব্দও করে নাই।

এককথায় জনগণের দিক থেকে তাদের সচেতন করা আর সচেতন প্রতিবাদ করতে সংঘটিত করা বলতে যা বুঝায় তার কিছুই করা হয় নাই। অথচ জনগণ যদি সম্যক উপলব্ধিতে সচেতন থাকত তবে তাদের সম্মিলিত প্রতিবাদই হত কনস্টিটিউশনের একমাত্র রক্ষক। মাঠে জনগণের সম্মিলিত প্রতিবাদ প্রতিরোধ যদি থাকত তবে এর সাহসই একমাত্র আদালতকে সাহসী করে বলাতে পারত যে, সুপ্রিমকোর্টের জুডিশিয়াল ক্ষমতা দুনিয়ার কেউ কেড়ে নিতে পারে না, সে ক্ষমতা কেড়ে নেবার আইন কেউই বানাতে পারে না। শেখ মুজিবের চতুর্থ সংশোধনী আইন অবৈধ ঘোষণা ও বাতিল করা হল। আমরা জানি কনস্টিটিউশনে যতই লেখা থাক যে, সুপ্রিমকোর্ট কনস্টিটিউশনের রক্ষক। তাহলে ওই লেখার তখনই অর্থ হয়, যদি সুপ্রিমকোর্টের মুরোদ দেখা যেতে পারে যদি মাঠে আসল রক্ষক জনগণ হাজির হয়ে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসে। কে না জানে মাঠে কেউ নাই, একা একা কিছু বিচারক শেখ মুজিবের শাসন ও চতুর্থ সংশোধনী আইন অবৈধ ও বাতিল বলার পর জান নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হত। হঠকারি বোকামি করে ফাঁসির কাঠে ঝুলে পড়া কোন বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না, সবার ওপরে জান বাঁচানো ফরজ।

এজন্য কনস্টিটিউশন প্রণয়নের ঘটনা কি, তা যতদূর সম্ভব জনগণকে সচেতনভাবে জানিয়ে, একইসাথে এক গণআন্দোলনে লিপ্ত করে সমাজকে আন্দোলিত করার একপর্যায়ে কনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা করতে হয়, রাষ্ট্র্র প্রতিষ্ঠিত ও দৃশ্যমান করতে হয়। কনস্টিটিউশন লিখে কায়েম করা যায় না, কিছু উকিল মোক্তার ধরে বিভিন্ন কনস্টিটিউশনের কাটপিস জোগাড় করে জোড়া দিতে পারলেই তা কনস্টিটিউশন হয়ে যাবে না। জনগণকে সচেতনভাবে জানিয়ে, সাথে এক গণআন্দোলনে লিপ্ত করে সমাজকে আন্দোলিত করার শেষে যদি জয়লাভ করা যায় তবে কনস্টিটিউশন এমনিতে সেখানে প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়। বাকি থাকে কেবল ফর্মালিটি; একটা কাগজে লিখে ড্রাফট করে কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলিতে তা পাশ করে আনা।

এভাবে কনস্টিটিউশন কায়েমের কাজ হাতে নেয়া একেবারেই রাজনৈতিক কাজ এবং কারও সন্দেহ থাকার কারণ নাই এটা র‌্যাডিক্যাল কাজ- বিপ্লবের কাজ। ফলে তা সর্টকাট সহজ রাস্তার কাজ না। এটা সহজ না বলেই সেই কনস্টিটিউশন কারও পক্ষে  -- তিনি শেখ মুজিব হলেও --এক কলমের খোঁচায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়াও সহজ নয়।

অথচ ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ বুঝনেওয়ালা মিশন এক্স এমন একটা বড় রাজনৈতিক কাজকে বাইরের ব্যাপক জনগণ দূরে থাক আদালতের করিডোরে প্রভাব বিস্তার করে ফেলার কাজ মনে করে। তাও আবার এজলাসের গুটি কয়েক উকিল ব্যারিস্টার কেবল সেগুলো নিয়ে এক কোটারি আইনি তর্ক করুক সেটাও এরা সহ্য করতে চায় না। একে তো ভেবে বসে আছে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে দিয়ে বেসিক স্ট্রাকচার কায়েম করে ফেলবে। এর ওপর আবার সঙ্গোপনে কেমনে চতুরতার সাথে তা আপিল বিভাগ পার করে আনবে এই হল এদের কাছে কনস্টিটিউশন ও রাষ্ট্র্র কায়েম। এই ধরণের কাজ, তৎপরতা ও নিয়তটাই তো খারাপ। আওয়ামী দলবাজি কায়েম করার কাজ এটা।  মিশন এক্স এর চিন্তার মুরোদের এমনই দুর্গতি। পাঠক লক্ষ করবেন, পঞ্চম সংশোধনী আইন বাতিলের এই ঘটনায় বিএনপির ভাবনা প্রতিক্রিয়া। প্রকাশ্যেই তারা বলছেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে এসব আবার বদলে ফেলব। এর সোজাসাপ্টা মানে যে পথে মিশন এক্স তার সংকীর্ণ ভাবনা আদালতের বিষয় বানিয়েছে। আদালত কবজা করে তারা তাদের কাজ করছে, দলবাজি করে তারা তাদের কাজ করছে। ঠিক একইভাবে বিএনপিও তার দলবাজি করে জিয়াউর রহমানের মহান ভূমিকা পুনরায় প্রতিষ্ঠা করবে। আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি,  নিশ্চয়ই বাংলাদেশ রাষ্ট্র্র আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সম্পত্তি না, হতেও পারে না। সমাজে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন কনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা করা ঘোরতর রাজনৈতিক কাজ, চিন্তার মুরোদ দেখানোর কাজ।

পঞ্চম সংশোধনী মামলাকে কেন্দ্র করে মিশন এক্স এর জনসমক্ষে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ আত্মপ্রকাশ হলেও এদের আরও প্রকল্প আছে। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে ইতিহাস ও তর্ক-বিতর্কের মীমাংসাকে আদালতের বিষয় বানানো, আদালতের রায় দিয়ে মুখ চেপে ধরে শহীদ মিনার প্রসঙ্গে রায় ঘোষণা ইত্যাদি থেকে শুরু করে সর্বশেষ জাতীয় সংসদে কনস্টিটিউশন সংশোধনের জন্য সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠিত হয়ে যাবার পরও একে এড়িয়ে ‘পঞ্চম সংশোধনী নিয়ে আপিল কোর্টের রায়ের সাথে সাথে আপনা আপনিই কনস্টিটিউশন সংশোধিত হয়ে গেছে কেবল পুনর্মুদ্রণ বাকি’ বলে শপথের প্রথম দিনে প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের সাংবাদিকদের স্বেচ্ছায় জানানো; সেই সাথে তৎপর সুয়োমোটো বোরখা মামলায় বিচারক এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী ও বিচারক শেখ মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ থেকে গায়ে পড়ে ‘বাংলাদেশ এখন থেকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, ‘পঞ্চম সংশোধনী বিষয়ে আপিল বিভাগের রায়ের সঙ্গে সঙ্গে ১৯৭২ এর আদি সংবিধান পুনঃস্থাপিত হয়ে গেছে’ ইত্যাদি গায়ে পড়ে মন্তব্য জুড়ে দেয়া --এসবই সেই কনসোর্টেড এফোর্ট; আইনি ভাষায় এটাকেই বলে পরস্পর যোগসাজসে ঘটানো ঘটনা, এক আইনি ক্যু; এ ক্যু কেস ইন জুরিসপ্রুডেন্স ।

মিশন এক্স এর চিন্তা যাই হোক এখান থেকে এর কাজ করার ধরন সম্পর্কে একটা ধারণা পাচ্ছি আমরা। সেটা হল, তাদের চিন্তা নিয়ে জনগণের কাছে যাওয়া না, কোন সামাজিক রাজনৈতিক আলোচনা পর্যালোচনার ভেতর দিয়ে মিশন এক্স নিজের চিন্তার ক্ষমতার পরীক্ষা দেয়া নয়, বরং এক ‘আইনি ক্যু’ করা। দেখা যাচ্ছে এরা আর কিছু পারুক আর নাই পারুক সামরিক ক্যু থেকে দেখে তারা এটাই সহজে শিখে নিয়েছে। এতে একটা জিনিস পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে যে, মিশন এক্স এর চিন্তার ক্ষমতার মুরোদ নাই; তাই ‘আইনি ক্যু’ করে নিজেদের চিন্তার অক্ষমতা, অযোগ্যতাই প্রকাশ করেছে।

শুধু তাই নয় নিজেদের অক্ষমতা, অযোগ্যতাকে কেউ যেন চ্যালেঞ্জ করে না বসতে পারে তাই সীমাহীন বেআইনিভাবে ‘আদালত অবমাননার’ এক ভীতিকর সামাজিক পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছে ঢাল হিশাবে। যাতে তাদের অক্ষমতা ও অযোগ্যতাকে কেউ প্রশ্ন না করতে পারে, এজন্য সবার মুখ চেপে ধরার এক ব্যবস্থা কায়েম করেছে। কেউ নিজের চিন্তার মুরোদ- নিজের সীমাহীন অযোগ্যতা ও অক্ষমতা টের পেয়ে গেলে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসাই তার একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠে। এছাড়া আর উপায় কি?

এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ‘আদালত অবমাননা’ বিষয়ক কোন আইন না থাকা সত্ত্বেও সর্বোচ্চ কোর্ট আপিল বিভাগ একাধারে নিজেই বাদী, নিজেই বিচারক, নিজেই আদালত অবমাননার বিচার করছে। কোন আইন বলে আদালতই সেই আইন প্রণেতা হয়? জাতীয় সংসদ নয় নিজের প্রণীত আইনে কোন অপরাধের শাস্তি কি হবে বেআইনি ও মনগড়া ভাবে তার নির্ধারণ আদালত করতে পারে তার নজির আমরা বাংলাদেশে দেখেছি।

দুনিয়ার কোন আইন-আদালতে এমন নজির বিহীন ঘটনা ঘটাতে পারে তা কল্পনারও অতীত। ‘বিচার শব্দটার মধ্যে যেসব মৌলিক ধারণা আগাম ধরে নিয়ে দুনিয়ায় চর্চা হয়ে বিচার ব্যবস্থা এ পর্যন্ত বহু দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে টিকে আছে সেই মৌলিক ধারণার গোড়ায় এরা কুঠারাঘাত করেছে। এটাই মিশন এক্স এর পরিণতি।

রাজনীতি মানে দলবাজি তো নয়ই, এই শাস্ত্রের মানে আইনশাস্ত্র বা জুরিসপ্রুডেন্সও নয়। এটা কি আমরা বুঝতে পারব! আমাদেরকে চিন্তার মুরোদ দেখাতে পারতে হবে, আর এই মুরোদই রাজনৈতিক ক্ষমতা এনে দেবে।


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


Available tags : সংবিধান, পঞ্চম সংশোধনী, চতুর্থ সংশোধনী, সামরিক আইন, মুন সিনেমা হল, বেসিক স্ট্রাকচার, জুডিসিয়াল রিভিউ

View: 8958 Leave comments (3) Bookmark and Share

1

A hooligan can drive out another thug from your house and eventually that hooligan start giving lessons of morality to your family members.

Sunday 07 November 10
haq

2

আপনার লেখাটির অসাধারণ একটি বিশ্লেষণাত্মক লেখা সন্দেহ নেই।ইতিহাসও জানা হয় আবার তার সাথে বর্তমানের যোগসাজটাও ধরা যায় পরিষ্কার ভাবে।তবে মতান্তরে যে কেউ লেখাটিতে অতীত নিয়ে কাঁদা ছোড়াছুড়ির গতানুগতিক প্রয়াসের গন্ধ পেতে পারে।বলতে পারে, পঞ্চম সংশোধনীকে ইম্যুনিটি দেয়ার চেষ্টায় আপনি চতুর্থ সংশোধনীর দিকে আগে আঙ্গুল উঠাচ্ছেন।আবার বুদ্ধিমান পাঠক মাত্রই এটা বুঝতে পারবে যে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান কিভাবে ঐতিহাসিক ভাবে ব্যর্থ হয়ে আসছে, যার দায় ভার বড় দুই যাত্রাদলের সঙদের ঘাড়ে সমান ভাবে বর্তায়, মূলত সমগ্র আলোচনাটাতে তারই একটি চিত্র ফুটে উঠেছে, ।আর পাঠ শেষে আসলে আমরা বাড়ি ফিরি হতাশা নিয়েই তবে শূণ্য হাতে নয়।আলোচনাটি আমাদের দেখায় সেই গতানুগতিক ব্যর্থতার চিত্র আর রাজনীতির নামে অরাজনৈতিক ডাইনামিক্স যেটি আসলে প্রতিটি স্তরেই বিদ্যমান।তবে এরকম আলোচনার দরকার আমি অস্বীকার করছিনা। আর হতাশার মধ্যেও এই লাইন গুলি আশার কথা শোনায় দিক নির্দেশনা ছাড়া্ই...... ''নতুন আমরা কি করতে পারি, সে ভাবনা চিন্তার ঝড় তুলে জনগোষ্ঠীগত স্বার্থে আমরা যদি আবার সংগঠিত হতে পারি, নিজেদের রাষ্ট্র নতুন করে গঠন বা কনস্টিটিউট করতে পারি সেই দিকেই আমাদের মনোযোগ ধাবিত হওয়া দরকার। যেন একটা জনগোষ্ঠীর সব অংশের প্রতিনিধিত্বমূলক কনস্টিটিউশন পেতে পারি সে লক্ষ্যেই কাজ করাটাই আমাদের একমাত্র প্রকল্প হয়ে ওঠা উচিত।''...

বাঙালীর চিন্তায় রাজনৈতিক ঝড়তো সবসময়ই।যার পেটে খাদ্য নাই তাকেও ওবামার ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহী মনে হয়।কিন্তু চিন্তার ঝড়টা সমাজের যে জায়গায় হওয়া উচিত সেই সব ভরা-পেটিদের মগজে ঝড় ওঠে বলে মনে হয়না।কবে কি ভাবে আমরা একটা ''সব অংশে''র প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র পাবো আর তার চালক প্রতিষ্ঠান গুলোকে সব অংশের জন্য নিবেদিত প্রাণ করতে পারবো জানিনা।

আপনার লেখাটায় দুটি সাধারণ প্রশ্ন:

- অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির ডিক্রি বলে শত্রু সম্পত্তি বা মালিকানা বিহীন সম্পত্তিকে রাষ্ট্র অধিগ্রহণ করেছিলো।মুন সিনেমার মালিকের উপস্থিতিতে এই ডিক্রি রাষ্ট্র কি করে তার উপর প্রযোজ্য করলো? এমনতো না যে মুন সিনেমার মালিকানা কে ছিলো রাষ্ট্র তা ঠাওরাতে পারেনি।মালিকের উপস্থিতিতে এই ডিক্রি কি করে তার জন্য প্রযোজ্য হলো? যতদূর জানি তিনি হিন্দু ছিলেন (আমার ভুলও হতে পারে)।এখানে ধর্ম কি কোন ফ্যাক্টর ছিলো?

- হাই কোর্টের রায়ে নিষ্পত্তি হবার পরও শিল্প মন্ত্রণালয় কেন জিয়াকে দিয়ে এরকম একটি এ্যাক্ট জারি করিয়ে সিনেমা হলটি অধিগ্রহণ করে রাখলো? কি ছিলো সেই হলে? সোনা দানা? দেশের এতো জায়গা থাকতে মুন সিনেমা হলটির দিকে এতো নজর ছিলো কেন সরকারের? খুব সাধারন অধিগ্রহণ একে ভাবতে চিন্তায় খটকা লাগে।অভ্যন্তরের কাহিনীটি কি?

পুরো লেখাটি অসাধারণ একটি বিশ্লেষণ। অনেক ধন্যবাদ লেখাটির জন্য।

Wednesday 10 November 10
estobdhota

3

Thanks a lot for a nice artical presented by you. Awami's should read this artical. But they can't tolarate anything against Mujib. Thats a great problem about Awami ignorent's.

Tuesday 09 October 12
Ahsan Habib
Go Back To Issues
EMAIL
PASSWORD